বিলায়েত হোসেন লিটন , বিশেষ প্রতিনিধিঃ কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন নগরকান্দার ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য মোঃ তিতাস শেখ (২৭)।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে রামু সম্মিলিত সামরিক (সিএমএইচ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে আহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। তাঁর বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে।
পরে তাঁকে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে করে রামু সিএমএইচে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সারে ৮ টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম শেখ আফজাল হোসেন। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে নগরকান্দার বারখাদিয়া এলাকার টুলু শেখের মেয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তবে এ দম্পতির কোনো সন্তান নেই।
তিতাস শেখের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
তিতাসের বাবা শেখ আফজাল হোসেন বলেন, আমারে প্রথমে মৃত্যুর খবর ফোনে জানায় ছেলের মামা চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার। এর পরে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা। আমার জীবনে আর কি আছে, একজন পিতার কাছে সন্তান হারানোর বেদনা সেরকম হয়, যার হারায় সেই জানে ব্যথার খবর।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন- “সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারযোগে মরদেহটি বিকেল ৪ টা ৩০ মিনিটে পৌছাবে বলে সেনাবাহিনী আমাদের জানিয়েছেন। পরবর্তীতে গ্রামের বাড়িতে বিকেল সারে ৫ টার মধ্যে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অনার সহ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হবে৷ এরপর পারিবারিক সিদ্ধান্তে দাফন করা হবে।
তিতাসের স্ত্রী শাওন তার স্বামীকে হারিয়ে শুধুই বিলাপ করে বলছেন- “আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার কোনো অস্তিত্ব রইলো না! আল্লাহ, আমি এখন কি করব!”
অপরদিকে শোকে পাগলপ্রায় মা রেখা বেগমও। তাঁর ভাষ্যমতে, গত বুধবার রাতে ছেলের সাথে শেষ কথা হয়েছিল তাঁর। তিতাস তখন বলেছিল- “আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।” কিন্তু তাঁর এমন কথা ছিল শেষ কথা তা ঘুনাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি মা রেখা বেগম। সন্তানের নিহতের খবর পাওয়ার পর থেকে শুধুই বিলাপ করে যাচ্ছেন।
বাদ জুম্মা ঢাকা সেনানিবাসে আনুষ্ঠানিক ভাবে জানাযা শেষ করে বিকাল সারে চারটার দিকে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের লাশ নগরকান্দা মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে এসে পৌছায়। পদ্মা সেনানিবাসের রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়ানের মেজর সোহেল আহমেদ তিতাসের লাশ গ্রহন করেন।
এরপরে উপজেলার লস্করদিয়া খন্দকার আতিকুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নানীর কবরের পাশে তিতাসের লাশ দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
এর আগে সেনাবাহিনীর একটি দল গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
জানাযায় প্রশাসনের কর্মকর্তা বৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সর্বসাধারণ মুসল্লীগণ উপস্থিত ছিলেন।
তিতাস শেখের মৃত্যুতে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু গভীর শোক ও শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
এছাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান মুকুল, নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শওকত আলী শরীফ, দৈনিক খোলাচোখ পত্রিকার সম্পাদক মাহবুব আহাদ, নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি বিলায়েত হোসেন লিটনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনও মরহুমের মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
Leave a Reply