মুন্সী হাবিবুল্লাহ : নদীর বুকে রঙিন নৌকার ছুটে চলা, মাঝি-মাল্লাদের সমস্বরে হেঁইও রবে মুখর চারপাশ। কোথাও কাঁসার ঘণ্টার ধ্বনি, কোথাও দর্শকদের করতালি আর উল্লাস। এমন উৎসবমুখর পরিবেশে মাগুরার মহম্মদপুরে মধুমতি নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। এ উপলক্ষে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন লাখো মানুষ। মানুষের পদচারণায় পরিণত হয় জনসমুদ্রে।

রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে অনুষ্ঠিত এ নৌকাবাইচ দেখতে মাগুরাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে ছুটে আসেন নানা বয়সী দর্শনার্থী। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে নদীর দুই তীরে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার অনেকে এসেছেন দূরদূরান্ত থেকে বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের এ আয়োজন উপভোগ করতে।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই দিন আগে থেকেই মধুমতি নদীর দুই পাড়ে বসে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। মেলায় স্থান পায় নানা ধরনের গৃহস্থালির সামগ্রী, খাবার, মিষ্টি, শিশুদের খেলনা ও বিভিন্ন পণ্যের দোকান। নৌকাবাইচের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরেও মানুষের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও তৈরি হয় বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য।

বিকেলে প্রতিযোগিতা শুরু হতেই নদীর বুকে জমে ওঠে বৈঠার লড়াই। মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার টানে একের পর এক নৌকা এগিয়ে যেতে থাকে লক্ষ্যের দিকে। প্রতিটি নৌকার এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তীরজুড়ে দর্শকদের উল্লাস বাড়তে থাকে। কখনো এক নৌকার সঙ্গে অন্য নৌকার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, আবার কখনো এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মেলার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহমেদ, মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
নৌকাবাইচ ও মেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ মৈমুর আলী মৃধা বলেন, অনেক দিন পর মহম্মদপুরবাসী এমন আনন্দঘন পরিবেশে নৌকাবাইচ উপভোগ করছেন। নদীর দুই পাড়ে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি এবং তাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখে খুব ভালো লাগছে।
দূরদূরান্ত থেকে নৌকাবাইচ দেখতে আসা দর্শনার্থী হুসাইন আলী বলেন, নৌকাবাইচ দেখতে তাঁর খুব ভালো লাগে। এখানে এসে অনেক আনন্দ উপভোগ করছেন। এত মানুষের সমাগম দেখে তিনি অভিভূত।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে খুলনার কয়রা থেকে এসেছেন আলী আকবর। তিনি বলেন, প্রতিবছরই তিনি এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। আগের বছরগুলোতে প্রথম পুরস্কারও পেয়েছেন। এবারও প্রথম হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, মহম্মদপুরের মধুমতি নদীর নৌকাবাইচ দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় ঘুরতে আসা সাগরিকা বলেন, প্রতিবছরই এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে মেলা ও নৌকাবাইচ উপভোগ করছেন। কেনাকাটাও করছেন। এমন আয়োজন যেন প্রতিবছর অব্যাহত থাকে, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। আধুনিক বিনোদনের নানা আয়োজনের ভিড়েও মধুমতির বুকে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ দেখতে মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে, বাংলার লোকজ সংস্কৃতি এখনো মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে জায়গা করে আছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নদী ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এ আয়োজন শুধু মহম্মদপুর নয়, পুরো অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকবে।
Leave a Reply