আলো ফিরিয়ে দেওয়ার এক মানবিক প্রয়াস,
ছানোয়ার হোসেন, মহালছড়ি(খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধিঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক দূরত্ব, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার অভাবে অনেক মানুষ বছরের পর বছর ভোগেন বিভিন্ন রোগে। বিশেষ করে ছানি রোগে আক্রান্ত বহু মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন তাদের দৃষ্টিশক্তি, অথচ সময়মতো চিকিৎসা পেলে তাদের জীবনে আবারও ফিরতে পারে আলোর ঝলকানি।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মানবিক দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মহালছড়ি জোন গ্রহণ করে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
গত ৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে মহালছড়ি জোনের উদ্যোগে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ আল-জাবির আসিফ, পিএসসি মহালছড়ি জোন কমান্ডার মহোদয়ের প্রচেষ্টায় পরিচালিত হয় একটি বৃহৎ বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পেইন। ক্যাম্পেইনে প্রায় ১,০২৫ জন রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক ছিলেন চক্ষুরোগী এবং অন্যান্য রোগীরাও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রায় ১২৭ জন রোগীকে ছানি অপারেশনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়, ১০০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চশমা প্রদান করা হয় এবং সকল রোগীকে বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ১২ মে ২০২৬ তারিখে আরও ৬০ জনকে চশমা বিতরণ করা হয়।
এই ক্যাম্পেইনের দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে তালিকাভুক্ত রোগীদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় ছানি অপারেশন করাতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তাদের জন্য বিনামূল্যে ক্যাটারাক্ট বা চোখের ছানির সার্জারির ব্যবস্থা করা হয়। ৬ জুন ২০২৬ তারিখে মহালছড়ি জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় মোট ১০৬ জনের একটি দল চট্টগ্রামের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে যাত্রা করে। তাদের মধ্যে ৮৪ জন ছিলেন ছানি অপারেশনের রোগী এবং ২২ জন ছিলেন সহায়তাকারী অ্যাটেনডেন্ট।
৮৪ জন রোগীর মধ্যে ৪৫ জন মহিলা ও ৩৯ জন পুরুষ ছিলেন। এছাড়া ৪৪ জন ছিলেন বাঙালি এবং ৪০ জন বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্য।
দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের সুবিধার্থে মহালছড়ি জোন অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অপারেশনের জন্য যাত্রার পূর্বে সকল রোগী ও অ্যাটেনডেন্টকে মহালছড়ি শিশুমঞ্চ হাইস্কুলে একত্রিত করা হয়।
সেখান থেকে তিনটি বাসে করে তাদের চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা করা হয়। দীর্ঘ যাত্রাপথে সকল রোগী ও সহযাত্রীদের জন্য হালকা নাস্তার ব্যবস্থাও করা হয় মহালছড়ি জোনের পক্ষ থেকে।
পুরো কার্যক্রমের নিরাপত্তা, সমন্বয় এবং সার্বিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে মহালছড়ি জোনের পক্ষ থেকে সাত সদস্যের একটি সেনা দল রোগীদের সঙ্গে প্রেরণ করা হয়।
এই দলটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে এবং রোগীদের প্রতিটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করে।
চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সকল রোগীর বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা হয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ৮৪ জনের মধ্যে ৭৬ জন রোগীকে অপারেশনের জন্য উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। বাকিদের চিকিৎসাগত কারণে পরবর্তীতে অপারেশনের জন্য নতুন তারিখ প্রদান করা হয়।
৭ জুন ২০২৬ তারিখে নির্বাচিত রোগীদের সফলভাবে ছানি অপারেশন সম্পন্ন হয়।
অপারেশনের পর রোগীদের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করে। তবে সঙ্গে থাকা ২২ জন অ্যাটেনডেন্টের জন্য খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। তাদের খাবারের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা মহালছড়ি জোন কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়।
অপারেশন-পরবর্তী পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে রোগীদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সেনা সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন রোগীরা নতুন করে আলো দেখতে শুরু করেন, তখন তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে আনন্দ, স্বস্তি এবং কৃতজ্ঞতার অনুভূতি।
কারও কাছে এটি ছিল বহু বছর পর আবার স্পষ্টভাবে পৃথিবীকে দেখার সুযোগ, কারও কাছে এটি ছিল নতুন জীবনের সূচনা।
চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর ৮ জুন সকল রোগী ও তাদের সহযাত্রীদের নিরাপদেনিজ নিজ এলাকায় সেনাবাহিনীর তত্তাবধানে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সফল অপারেশনের পর রোগীদের হাসিমুখ, পরস্পরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এবং নতুন আশায় উজ্জীবিত হয়ে বাড়ি ফেরা-এসব দৃশ্য যেন এই মানবিক উদ্যোগের প্রকৃত সার্থকতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং জনসেবার অনন্য সমন্বয়ে মহালছড়ি জোন শুধু চিকিৎসা সেবাই প্রদান করেনি, বরং শতাধিক মানুষের জীবনে ফিরিয়ে দিয়েছে নতুন আলো, নতুন আশা এবং নতুন সম্ভাবনা।
উল্লেখ্য যে এই সফল কার্যক্রমে মহালছড়ি জোনের জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল মোঃ আল-জাবির আসিফ, পিএসসি মহোদয়, মেজর মিনহাজুল আবেদীন চৌধুরী, এ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন মোঃ গোলাম নাহিদ, আরএমও ক্যাপ্টেন মোঃ বোরহান উদ্দিন সহ জোনের সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাস্তবায়ন হয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের পাশে থেকে তাদের জীবনমান উন্নয়নে মহালছড়ি জোনের এ ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে-এই প্রত্যাশাই সকলের।
Leave a Reply