কবি পরিচিতি
ব্যক্তিগতভাবে আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত কবি মাহবুব মিত্র। পিতা: মোঃ মতিউর রহমান চৌধুরী, মাতা: মোসাঃ জয়গুননেসা বেগম। ভাইবোন: ৯ ভাই ১ বোন। জন্ম: ১লা ডিসেম্বর ১৯৮১। পৈতৃকনিবাস: গ্রাম-কদমশ্রী, উপজেলা-মদন, জেলা-নেত্রকোনা। ঢাকায় বসবাস ১৯৯১ সাল থেকে। লেখাপড়া: মাস্টার্স, ইংরেজি সাহিত্য। থিসিস: আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় প্রকৃতি ও মানবতা। মূলত তিনি ইংলিশ গ্রামার, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের। মুক্তমনা শিক্ষক।
তার প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: ১. জননীর করতলে কবিতার মিছিল ২. অমীমাংসা কবিতার রক্তাক্ত সংলাপ ৩. আমি নীল পাহাড়ের গান ৪. ভালো থেকো নীল আকাশ ৫. শাদা কফিনে মেঘের শব্দ ৬. মার্বেল পাথরের গহীন ছায়া ৭. জলের নিচে অনন্ত দুপুর ৮. প্লাস ভর্তি নীল ছায়া ৯. আমি দীর্ঘস্থায়ী বেদনার উল্লাস ১০. জলের ডানায় পাখির পালক ১১. বুকের পাঁজরে বালিকার আকাশ ১২. তোমার হাসি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রকাশিত কথামালা-উক্তি-সংলাপ: ১. আমার বিশ্বাস আমার অবিশ্বাস ২. আমার বিশ্বাস আমার ভাবনা ৩. টুকরো কথা সত্য সংলাপ ৪ আমার কথা উড়াল পাখি প্রকাশিতব্য গ্রন্থ ১. আমার আয়না কবিতা মিত্র ২. তুমি একটা সুগন্ধি খানকিফুল ৩. সোনালি অন্ধকারে মাতাল রাজা ৪. ঈশ্বরের আস্তিনে ভোরের সংগীত ৫. আমার কথা মাতাল ঘুড়ি ৬. হৃদয় নিংড়ানো আনন্দ বেদনা।
১।
জীবনের বিষণ্ণ চিয়ার্স
আমি কোথাও নেই হারিয়ে গেছি জলে কোথাও পাবে না আমার ছায়া-নিঃশ্বাস
কোথাও পাবে না আমার তামাটে দেহের ঘ্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রহাওয়ায় জলের নিনাদে
আমি কোথাও নেই শুধু শূন্যতার কলরব ছবির ফ্রেমে স্থির পাহাড়
নিঃসঙ্গ গাছের আকুতি মুখের মায়া নেই চোখের মায়াবী তীর নেই
আমি কোথাও নেই শুধু ফ্রেমবন্দী ডাহুকচিঠি এখন কোথাও কোনো ডাকঘর নেই
ঠিকানা জলের ঢেউ উড়াল পাখি একূল-ওকুল আকুলিবিকুলি আকুলমায়া নির্জন রাত
দূরমনের হাহাকার হৃদয়ে ধোঁয়ার অনুবাদ আমি কোথাও নেই
আকাশের কার্নিশে ঝুলে আছে নিশিগন্ধা আমিও কোথাও নেই
শব্দের জাদুমাখা পুকুরে স্বপ্নপুরী শব্দপাখির মতো হারিয়ে গেছি রৈখিকসীমায়
বুকের মায়ায় হারিয়ে গেছে ভোর মাতাল সন্ধ্যা আমি কোথাও নেই শুধুই জীবনের বিষণ্ণ চিয়ার্স।
আমি কোথাও নেই, আব্বার কবরের মতো স্তব্ধ
আমি কোথাও নেই মায়ের কবরের মতো শান্ত…
২।
রক্তাক্ত শিশুফুল
আমার প্রায়শই মৃত্যু ঘটে তোমার কম্পিত গোপন নিঃশ্বাসে
কফিনের ভিতর খরগোশের ছায়া ছায়ায়-ছায়ায় সময়ের গোল্লাছুট
একজীবনে আপেল আর কদমফুলের তেমন তফাৎ থাকে না—গ্যাস লাইটারে জ্বলে ওঠে চোখ
সারারাত একটানা কাঁদছে আত্মার শিখা ক্ষণস্থায়ী বাগানে বন্দি হয়েছে কয়েকটি কবুতর
মোরগ-মুরগীর কুকুর-কুকুরীর উল্লাসে-উল্লাসে অবিরাম ভেসে যায় জলের কফিন আর ছায়াঘর
তোমাদের অন্ধ চোখের ভিতর খেলা করে একজোড়া রক্তাক্ত শিশুফুল—বেদনার কফিনঘর
তারপরও আমরা ছুটে যাই জীবনের অনিশ্চিত বাঁকে তারপরও আমাদের কপালে ভোরের সূর্য জীবন আঁকে….
৩।
পোয়াপিঠাপ্রেম
পোয়াপিঠা শেষ হওয়ার আগেই বেজে উঠলো বিদায়-ঘণ্টা
তারপর তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে সীমাহীন অসীম সীমান্ত অনন্তকাল ধরে…
পোয়াপিঠা কখনো হারিয়ে যায় জোয়ার আসরে কিংবা গাঁজার কলকিতে
কখনো-বা হয়ে যায় চাতক পাখি জলসাগরে কিংবা জলসাঘরে…
‘কালাম শেখ-রমা ভৌমিক এখনো কি স্কুলের পাশে প্রেমের এক্কাদোক্কা খেলে
নাকি নদীর পাড় ধরে স্রোতের মতো বিরহের গান গায়
সময় কি সবকিছু ভাসিয়ে দেয় ইতিহাসের খেরোখাতায়
‘কালাম-রমা’র মতো তোমরা কেনো স্পর্শ করতে পারো না প্রেমের রঙধনু
রঙধনু জীবনের সাতরঙ্গা বাজার প্রেমখেলা চলুক হেরেমখানায় রাজার..
আমার নিমগ্ন বিরাগী আয়নায় ভাসে তোমাদের মাতাল কামাসক্ত প্রেমচুম্বন।
৪।
যারা রাজনীতি বোঝে না তারাও নাগরিক
কলমগুলো টেবিলে ছড়ানো খাপখোলা একদম আমার মতোন
আমি যে-রকম আকাশের নিচে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে
এবং প্রিয়ার উন্মুক্ত বাহুমূলে কিংবা পারদের নদীতে
আমার মুখে চুমুনেশার আপেলগন্ধ সারাদেহে-শরীরে জীবনের মাদকতা
মাছগুলো খাবার হয়ে যায় বাতাসের হাটে নারীরা হয়ে যায় আমলাপাড়ার আনন্দপণ্য
যারা রাজনীতি বোঝে না তারাও নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য যায় মিছিলে
শাসকের কৌশল সবাই বোঝে না যারা বোঝে তারা গৃহবন্দী কিংবা ক্রসফায়ারের তালিকায় ঝুলন্ত
মেঘের মতো দলাপাকিয়ে মানুষগুলো দিশেহারা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে দেখছে আগুনের মৃত্যুশিখা
সবখানে ভাগাড়-ধ্বংসস্তূপ আঙিনায় তুমুল ঘূর্ণিঝড় একদিন আমজনতা জেগে ফিরে পাবে নৈসর্গিক প্রান্তর
ফলবর্তী হবে পাতাহীন বৃক্ষ আবার পাতাহীন বৃক্ষ হবে
ফলবর্তী মানব-মানবীর প্রেমকাম-সঙ্গমানন্দ জন্ম হবে দেবশিশু যীশুর।
৫।
আমি তোমারই সন্তান
আমি তোমারই সন্তান পিতা—তুমিতো আমার মাটির গান তোমার চোখ পাথরগলা নদী
তোমার মুখ আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ বিশ্ব যখন বেহায়াদের খপ্পরে ছিন্নভিন্ন
পতাকায়-পতাকায় নামে গাঢ় অন্ধকার তোমার সন্তান তখন লিখতে বসে তোমারই অসমাপ্ত এপিটাফ
তোমার বুকে লিখে রাখি মানবজমিন— ইতিহাসের ধারাপাত সময়ঘড়ি গলে-গলে মিশে যাচ্ছে
গলিত আগুনের ভিতর, পিতা আমিতো তোমারই সন্তান পড়ে থাকি বিভৎস ছন্দহীনতায়
ইতিহাসের বাঁকে-বাঁকে শুয়ে আছে—অপেক্ষমান বিশ্বাসঘাতক বাতাসসন্তান
আগুনমুখী সাপিনী ফণা তুলে বসে আছে জননীর শয়নকক্ষে
ইতিহাসের পরাজিত ঘোড়াগুলো এখনো যুদ্ধের মাঠে বেওয়ারিশ শকুন
পিতা এই থ্যাঁতলানো মুখগুলো আমার ঘুমের দুঃস্বপ্ন—বোনের নিবিড় বেদনা
মানচিত্রের রেখায়-রেখায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের আঁধারমানব বিকৃত কসাই
পিতা দিনে-দিনে আমিতো হয়ে যাচ্ছি একা নিঃসঙ্গ নীড়হারা ব্যথিত কুসুম দলে-দলে
পাঁক খেতে-খেতে ওরা লুকিয়ে যাচ্ছে আধারের গুহায় বিশ্বাসঘাতকের দল
বাতাসের জমিনেও নির্মাণ করছে হায়েনার খামার: পিতা তোমাকেই জেনেছি
মানবতার যীশু ইলেক্ট্রার গান সমাজতন্ত্রের ঝরনা পিতা তোমাকে যারা হত্যা করেছে
এই অবেলায় সময়ের ডাগর চোখ বেঁধে তারা এখন উদ্ধত আঙুল তুলে আমাকেও শীসায়
আমি তোমারই সন্তান বলে।
Leave a Reply