কবির ভাষায় বলতে হয় ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা।’ বাস্তবতা এই ছন্দের পরিপুরক আমাদের দেশের জন্য। গত শতাব্দীর আশির দশকেও হিসেব করা হতো এদেশের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। পরবর্তীতে সেই জায়গা দখল করে নিল পোশাক শিল্প। তারপরে তাকেও ডিঙিয়ে পার হয়ে এলো রেমিটেন্স। পোশাক শিল্পের জন্য শিল্পপতিরা এবং রেমিটেন্সের জন্য আমলারা বাহবা নিলেও কৃষিকে বাদ দিতে পারে না কেউই। কারণ, শিল্পের কাঁচামাল যোগায় কৃষি। কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে তারাও কৃষকেরই সন্তান। রেমিটেন্সের বেলাতেও সেই একই ব্যাপার। বিদেশে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকেরাও কৃষকেরই সন্তান।তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি কৃষি ও কৃষক বাদ দিয়ে কোনটিই সম্ভব হচ্ছে না। অথচ, এই কৃষি এবং কৃষকই সবচেয়ে অবহেলিত।
এদেশের কৃষক কেবল অবাদে দিয়েই গেল। পেল না কিছুই। ’৭১-এর যুদ্ধের ময়দান রক্তে ভিজিয়ে দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনলো। তার নামও লেখা হলো না কোথাও। গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায় আবার জীবন দিল ঊননব্বই-এর গণ-আভ্যুত্থানে। স্বৈরাচারের আপাতত পতন হলেও কৃষক পেল না তার অধিকার। বারবার ধোকা খায় কেবল বাংলার কৃষক।
গ্রামীণ ক্ষেতমজুরেরাও সেদিন জীবন দিয়েছিল। তারা সেদিন দাবি করেছিল তার একদিনের পারিশমিক চার সের চাল অথবা সমপরিমাণ মূল্য দিতে হবে। সারাদিনের বদলে ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবিও ছিল তাদের। তাদের দাবির প্রাপ্যটা হাতেনাতে পেয়ে গেলেন তারা।
এখন গ্রামীণ ক্ষেতমজুরেরা ৮ ঘণ্টারও কম সময় কাজ করছেন। তাদের পারিশ্রমিক দাবির চেয়ে বেশি পাচ্ছেন। বাস্তবে তাতেও তাদের সঙ্কুলান হচ্ছে না। এর কারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। কিন্তু কৃষক আর কত দিবে!
আসলে কৃষক এবং ক্ষেতমজুর উভয়েই সঙ্কটে পড়ে আছে। কৃষিপণ্যের যে দাম তাতে লোকসান হচ্ছে চাষ করে। ক্ষেতমজুরদের সারা বছর কাজের নিশ্চয়তা নেই। ধার দেনা করে, এনজিও থেকে চড়া সুদে লোন নিয়ে সন্তানদেরকে বিদেশ পাঠাচ্ছেন তারা। এই বিদেশ পাঠাতেও হতে হয় নানাভাবে হয়রানি। অনেক চড়া মূল্য দিতে হয় এজেন্টদেরকে। অনেকে বিদেশ যেতেও পারেন না। টাকাও ফেরত পান না।
এসব হয়রানি থেকে এই গরিব মেহনতি মানুষদের মুক্ত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। যেমন, বিগত শেখ হাসিনার সরকারের ১৬ বছরের অপশাসনকালে আমরা দেখলাম আটাশ লক্ষ কোটি চুরি করা হয়েছে। এই টাকা যদি তারা চুরি না করে এই গরিব মেহনতি মানুষদের ভর্তুকী দিয়ে তাদের সন্তানদের বিদেশ পাঠাতে সাহায্য করতেন তাহলে এদেশের অর্থনৈতিক গল্পটাই ভিন্ন হতো। বাংলাদেশের নাম লেখা হতো বিশ্বের প্রথম সারিতে। এখন থেকে আর যদি একটি টাকাও কেউ চুরি না করে এ ধরনের কাজে বিনিয়োগ করা হয় তাহলে দেশ দশ বছরের মধ্যে অবশ্যই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ হবে। হ্যাঁ, সরকারী উদ্যোগে বিদেশ পাঠানোর পর তাদের আয় থেকে সরকার সেই খরটা কেটে নিবেন সরল সুদে। তাহলে আর কাউকে হয়রানিও হতে হবে না। নিতান্ত গরিব মানুষের সন্তানেরাও বিদেশ যেতে সক্ষম হবে। তাতে দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে।
দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করতে একটি সহজ উপায় হিসেবে এটি একটি সহজ পদক্ষেপ হতে পারে। যদি আমরা সহজে এটি গ্রহণ করি। তবে অতি অল্প সময়ে বেশি কাজের মধ্যেও অন্তরবর্তী সরকার যদি পদক্ষেপটি নিতেন তাহলে এটি একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকতো।
নির্বাহী সম্পাদক
Leave a Reply