পরিচিতিঃ
হিমাংশুদেব বর্মণ ১৯৭৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলাধীন দীঘলগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এই গ্রামেরই জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা তার। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের সাথে সখ্য তার। কবিতাতেও রয়েছে তার সমান পদচারণা। তিনি দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার জন্য বেশ প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। তার মধ্যে গল্প, কবিতা, সাহিত্য সমালোচনাসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপর বিশেষ নিবন্ধ লেখেন। বর্তমানে তিনি তিনি দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন। এছাড়া তিনি একটি অনলাইন পোর্টালের সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন।
গোলক ধাঁধা
মাঝে মাঝে এক ঘুম রাতে কি যেন আজেবাজে কথা বলে চেঁচিয়ে ওঠে নোবেলা। পাশের বাড়ির মানুষগুলোও জেগে ওঠে সে চিৎকারে। কেউ জিজ্ঞাসা করলে কিছু বলতে পারে না। ও কোনো স্বপ্নও দেখে না। তবে কেউ নাকি ঘুমের ঘোরে এসে স্বপ্ন দেখাতে চায়। আবার মিলিয়ে যায়। সেই না পাওয়ার বেদনাতেই বোধ করি চেঁচিয়ে ওঠে নোবেলা। কিন্তু যখন কথা ওঠে, তখন নোবেলাই বলে, ও নাকি স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। স্বপ্ন খুব ভয়ঙ্কর একটা সত্ত্বা। কী জানি বাবা, স্বপ্ন দেখতে দেখতে কখন কোন স্বপ্নে পেয়ে বসবে, তাহলে আর বাঁচন নেই। এভাবে বলতে বলতে সেখান থেকে সরে পড়ে নোবেলা।
দেশের সমতলে বাস করা একটি খাঁটি বাঙালি মেয়ে নোবেলা। কবে থেকে কী কারণে স্বপ্নকে সে ভয় পায়, সে ঠিক বলতে পারে না। ওর নিকট—আত্মীয়রা কেবলই ভাবে ওকে বাগানচরা পাঁচাপাঁচিতে ধরেছে। নোবেলা এসব বিশ্বাসই করে না। নিজের শোবার ঘর আর বাড়ির আশ—পাশের বাগানগুলোতে ওর আসা যাওয়া। কেউ কোনো প্রশ্ন করলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে অতি সয়ক্ষেপে উত্তর দিয়ে কেটে পড়ে। তার বেশির ভাগ উত্তরেই থাকে হঁ্যা অথবা না জাতীয় সংক্ষিপ্ত কোনো সংকেত।
টেলিভিশনের সামনে বসে রিমোটটা হাতে নিয়ে টিপে টিপে শুধুই চ্যানেল বদলায়। কোনো চ্যানেলের অনুষ্ঠান ভালো লাগে না ওর। বিজ্ঞাপনে গায়ে জ্বালা ধরায়। বিরক্তিভরে ‘ধ্যা—ৎ’ বলেই রিমোটটা বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
নোবেলার বয়স হয়েছে। এখন যদি সে এমন করে, মানুষ তাকে পাগল বলে জানবে। বিয়ে দেয়াটা মুশকিল হয়ে যাবে। আরো ভাবার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, গত কয়েকদিন হচ্ছে, সব কথা বলছে উল্টো। আগুনকে বলে ঠাণ্ডা, বরফকে বলে বাপরে, কী গরম! তবে অসহ্য লাগে দুটোই। কেউ কিছু বোঝাতে গেলে বলে, আমারে তোমরা আবোল তাবোল বোঝায়ও না। আমি যা বলি তাই শোনো, আমিই ঠিক।
এসবের মানে তো কারো বোঝার কথা নয়। একটা পাগলের সাথে বসে কে বক্বক্ করবে? কারো সময় এবং ধৈর্য্য কোনোটাই নেই। কিন্তু চলন—বলন, নাওয়া—খাওয়া, সংসারের কাজ—কর্ম, সব ঠিক আছে। শরীরে যত্ন নিচ্ছে নিয়মিত। তার সমস্যাটা যে কোথায় কেউ তা বোঝে না। অভিভাবকরা তাকে ডাক্তার দেখাতে চাইলে হেসে বলে এ—ভুল তোমরা করো না। শেষে ডাক্তার তোমাদেরই ধরে পাগলা গারদে পুরে দেবে। এবার একটু উচ্ছসিতভাবে হেসে চলে যায় সেখান থেকে।
লেখাপড়া উচ্চ মাধ্যমিক। গরিব পরিবার। এরপর আর সম্ভব হয়নি উচ্চশিক্ষার। মানুষের ধারণা, পড়াশোনা বাদ দেয়ার কারণে, ওর মাথায় ছিট হয়ে গেছে। নোবেলা এটাও বোঝে, পাগল কোনোদিন নিজেকে পাগল বলে স্বীকার করে না। বরং তার সামনে দাঁড়িয়ে যদি একবার তাকে পাগল বলেছ, তাহলে মার খাবে অনিবার্য। না হলে অকথ্য গালাগাল। তাই নোবেলা চুপ করে থাকে। সে বোঝে, সে যদি বারবার বলে সে পাগল না, তবে সে পাগল বলেই বিবেচিত হবে সমাজে। তাই সে মাথায় ছিটের কথা শুনলে কোনো কথা না বলে সরে যায় সেখান থেকে।
নোবেলার বন্ধুরা মাঝে মধ্যে দেখতে আসে। তাদের সাথে স্বাভাবিক আচরণই করে। কিন্তু কথাগুলো উল্টোপাল্টা থেকেই যায়। শুধু নামগুলো ঠিকঠাক বলে। বন্ধুদের মধ্যে থেকে তুহিনকে ডেকে বলল নোবেলা; তুহিন, তুই—ই প্রথম আমাকে টুইন টাওয়ারের গল্পটা বলেছিলি। মনে আছে তোর? আমি কেমন কেঁপে উঠেছিলাম! তুহিন বলল বলিস কী রে? আমি তো টুইন টাওয়ার ভেঙে পড়া ছাড়া তার কোনো ইতিহাসই জানি না।
ওটাই তো বলেছিলি। সেই থেকে জানিস তো, আমার বুকের মাঝে সেই ভেঙে পড়ার আওয়াজটা প্রায়ই শুনতে পাই। আমি একদিন মনে করলাম, তোর কাছে গিয়ে বসে টুইন টাওয়ারের পুরো ইতিহাসটা শুনব। তা আর হলো না। তুহিন যেন কিছু বলতে চাচ্ছিল। নোবেলা বাধা দিয়ে বলল, কথার মাঝে কথা বললে আমি রেগে যাই কিন্তু। তুহিন চুপ করে রইল। শোন, একথা ভাবার পর একরাতে স্বপ্নে দেখি কোনো এক শহরে গেছি পড়তে। তুইও সেই শহরে, একই ভার্সিটিতে। আমি তোর বাসা চিনি না। ফোনে বললাম তুহিন, তুই আমাকে তোর বাসাটা চিনাবি না? তুই বললি চলে আয়। একটা গাড়িতে উঠে, কী যেন, ও—হ্যঁা, মনে পড়েছে গোলক ধাঁধার মোড়ে নেমে পড়বি। ওখান থেকে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করবি তুহিন কোন বাড়িতে থাকে? তোকে দেখিয়ে দেবে। বাপরে, আমি তো খুশিতে আট না আঠারো খণ্ড হলাম তা মনে রাখিনি। তুই এতো বড় ভিআইপি হয়ে গেছিস, সবাই তোকে চেনে। সত্যি, গোলক ধাঁধার মোড়ে নেমে এক বাদামওয়ালার কাছে তোর নাম বলতেই বলে কি না, তুহিন তো থাকে টুইন টাওয়ারে। আমি বললাম সেটা আবার কোথায়? ঐ বেটা দাঁত কেলায়ে হেসে কয়, আফায় তাও জানে না। শোনোনি, লাদেন ভাইঙ্গে দিছিলো, আমেরিকার টুইন টাওয়ার!
আমি বললাম, সেটা তো ভেঙে গেছে। ও বলে না আফা, সব তালা ভাঙ্গে নাই। লাদেন খালি উপরের কয় তালা ভাঙ্গিছে। নিচের তালাগুলো সব ভালো আছে। সেই খানেই আমাগের তুহিন ভাই বরাদ্দ পাইছে।
কিন্তু আমি তো এসব কিছু জানি না। সে দেখা করতে বলল—
দেখা করবেন? যান সোজা এই পথে চলে যান।
সে কী, পাসপোর্ট, ভিসা, বিমান টিকিট এসব কিছু লাগবে না?
কিচ্ছু লাগবে না। এইডা ডিজিটাল যুগ, আপনে যান আমার আর সময় নাই। এই বাদেম—।
এবার তুই বল, আমার তখন কী করা উচিৎ ছিল?
ঐ বাদামওয়ালারে দশটা টাকা দিয়ে এক ঠোঙা বাদাম কিনে খেতে খেতে হেঁটেই বাড়ি চলে আসা উচিৎ ছিল।
তুই তো পাগল রে—! হেঁটে বাড়ি আসতে গেলে আমার ঘুম ভাঙতে কয়দিন লাগত তা হিসেব করে দেখেছিস? যাক সে কথা। তোর সাথে দেখা করা আমার হলো না। ফিরে আসতে পথে গাড়ির ভেতর থেকে দেখি এদেশেরই অন্য একটা ভেঙে পড়া দালান ‘রানা প্লাজা’র ধ্বংসাবশেষ থেকে হাত নেড়ে নেড়ে আমাকে ডাকছিস—নোবেলা, নোবেলা এই দেখ আমি এখানে, এই বিধ্বস্ত পুরীতে। তারপর কী হলো জানিস? গাড়িটা এমন গতিতে ছাড়ল, আমি নেমে তোর হাতটা যে টেনে ধরব তা আর হলো না। বন্ধুকে তো বন্ধুই রক্ষা করে। কিন্তু সে সময়টা এখন কারো নেই। আমিও তাদের মধ্যে একজন।
তুহিন বলল, স্বপ্নে অনেক কিছু দেখে মানুষ। ওটা শুধু স্বপ্নই। ওসব নিয়ে ভাবতে নেই।
না রে তুহিন, এটা অনেকটাই বাস্তব। মানুষ যেন সত্যি সত্যিই বদলে গেছে। স্বামী স্ত্রীকে খুন করছে, স্ত্রী স্বামীকে। ভাইয়ে ভাইয়ে তো চলছেই, বাপ—বেটাতেও। কারো প্রতি কারো আস্থা রাখার মতো নেই। মানুষের এই নৈতিক অবনতি কেন হলো বল তো?
আমাকে বিয়ে দিতে সবাই উঠে পড়ে লেগেছে। আর বিয়ের কথা ভাবলেই আমার মাথায় বাজ পড়ে। কী জানি, কার হাতে পড়ব, সে কেমন হবে! সে আমাকে খুন করবে, না আমি তাকে, এসব আর কী!
কথা তো সব ভালোই বলছিস। লোকমুখে বাতাসভাসী কথা শুনছি তুই পাগল হয়ে গেছিস। কী যেন সব উল্টো পাল্টা বলছিস—
তুহিনকে থামিয়ে দিয়ে জবাব দিল নোবেলা। এজন্যই তো আমি পাগল। চারপাশে ঘটে যাওয়া সব অঘটনগুলোকে তোরা বলিস সাধারণ ব্যাপার। মানুষে মানুষে হানাহানি, মার—মার কাট—কাট সম্পর্ক এসব কিছুকেই তোরা বলিস সাধারণ ব্যাপার। কোনোটা আবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দিস। তাহলে আমি যদি গরমকে ঠাণ্ডা আর ঠাণ্ডাকে গরম বলি, তাহলে তো তোদের মতো করেই বলা হলো। সমস্যাটা এখানেই। যখনই তোদের তালে তাল মিলিয়ে চলতে চাই, তখন তোরাই বাধা হয়ে দাঁড়াস। এটা কেন? তাহলে তোরাই ঠিক করে বল। দেখবি আমি ঠিক আছি। আরে আমি তো সেই গোলক—ধাঁধার মোড়েই দাঁড়িয়ে আছি। আমার তো ঘুম ভাঙেনি। এই, আমার গায়ে একটা চিমটি কেটে দেখ তো। তোর যেখানে খুশি। একটা চিমটি কেটে দে, আমি জেগে উঠি।
এই— না। ছেলেদের দিয়ে বিশ্বাস নেই। তোদের কৌতুহল শুধু ঢাকনার নিচে কী আছে তাই দেখা। না থাক। এমনিতেই তোরা ডাকাত স্বভাবের। কেড়ে খেতে ওস্তাদ। তারপরও যদি চামচে তুলে মুখের কাছে ধরি….।

Leave a Reply