কবি পরিচিতিঃ তুহিনা সুলতানা বাংলা সাহিত্য জগতে এক নিবেদিতপ্রাণ কবি। যাঁর লেখায় অনুভূতির গভীরতা ও চিন্তার প্রগাঢ়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করা এই সাহিত্যপ্রেমী ভারতের পশ্চিম বঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোটে বসবাস করছেন। সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি জীবন, স্মৃতি ও আত্মোপলব্ধির সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো প্রকাশ করে চলেছেন। তাঁর লেখনীতে ভালোবাসা, বেদনা, নিঃসঙ্গতা ও সময়ের অনিবার্যতা সুনিপুণভাবে ফুটে ওঠে, যা পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটে।
১ নং কবিতা
গভীর ভালোবাসা
যে আমার চোখের সামনে নেই
তবু সে জেগে থাকে দৃষ্টি জুড়ে
আলো-ছায়ার খেলায় দেখি তার ছায়া
তাকে ছুঁতে চাই, অথচ সে থাকে দূরে।
যে আমার অন্তরে বাস করে
তার সঙ্গেই চলে দিনের আলাপন
শব্দের প্রয়োজন হয় না
তবু হৃদয় বলে যায় মনের সব অজানা গল্প।
যে আমার সঙ্গে নেই
তার অনুপস্থিতি জুড়ে আমার অস্তিত্ব
সব কথার ফাঁকে থাকে সে নাম
সব স্মৃতির ভাঁজে তার মুখ।
তাকে ভালোবাসার নেই কোনো সীমা
তার জন্যই লিখি প্রতিটি কবিতা
তার শূন্যতা পূর্ণ করে কি আমার মন
তার নীরবতা গড়ে তোলে ভালোবাসার সেতু।
দূরে মানেই নয় হারিয়ে যাওয়া
বরং এ এক নতুন উপস্থিতি
যেখানে সে আমার প্রতিটি শ্বাসে
প্রতিটি স্পর্শে প্রতিটি নিঃশব্দ কথায়।
তুমি নেই তবু আছো—
আমার দৃষ্টি হৃদয় আর ভালোবাসার মাঝে
যত দূরেই থাকো তুমি থাকো কাছেই
আমার জীবনের প্রতিটি পরতে প্রতিটি ক্ষণে।
২ নং কবিতা
মেঘলা প্রান্তর
এখানে ঢেউ নেই
শুধু নীরবতার বিস্তৃত এক মেঘলা প্রান্তর।
ভালোবাসার শব্দ থেমে গেছে বহু আগে
বাতাসও ক্লান্ত বয়ে আনে শূন্যতার গন্ধ।
মন একা, যেন পরিত্যক্ত নৌকা
নিরালার সমুদ্রে ভেসে চলে দিশাহীন।
এখানে কেউ ডাকে না নাম ধরে
কেউ শোনে না হৃদয়ের গোপন আর্তি।
অদৃশ্য দেওয়ালে আটকে যায়
প্রত্যাশার মৃদু স্পর্শ।
আলো আসে না শুধু ছায়া নামে
রাত গভীর হয় আর অশ্রুতে ভেজে।
এই স্থবির ভুবনে
যেখানে স্বপ্নও এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধা
সেখানে হৃদয় খুঁজে ফেরে ঢেউয়ের আহ্বান।
কোথাও যেন একটি ঢেউ এসে
ভাঙুক সব বাঁধ মুছে দিক ব্যথার রেখা।
আসে না সেই ঢেউ
কেবলই স্মৃতির রেশ বয়ে আনে জোয়ার।
এই শূন্য প্রান্তর ছেড়ে যেতে হবে
যেখানে ঢেউ ছুঁয়ে যাবে হৃদয়ের কোল
আকাশ ঝরে পড়বে মুক্ত বৃষ্টির মতো
আর ভালোবাসা হবে অবাধ অকপট।
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে থাকবে
একটি জীবনের গান
প্রাণভরে শুনবো সেই ঢেউয়ের ডাক
যা নীরবতাকে ভেঙে
জাগিয়ে তুলবে আমায় নতুন আলোয়।
আমি চলি সেই ঢেউয়ের খোঁজে
যেখানে জীবন আর মৃত্যু মিলবে ভালোবাসার ছন্দে।
৩ নং কবিতা
নিঃসঙ্গতার নির্জন মহল
নিঃসঙ্গতা এখন আর বেদনার নাম নয়
এ এক গভীর তীর্থ
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস
আমাকে পৌঁছে দেয় আমার অন্তর্লোক।
ভাঙা স্মৃতির কোলাজ আর
রঙচটা রামধনুর ছাইভস্মে
জেগে ওঠে এক অমল নীলাভ সত্য।
পৃথিবী আমাকে শিখিয়েছে
ভুলতে সেই হাসির দিন
আর চোখের কোণে লুকানো বৃষ্টি।
তবু কিছু স্মৃতি
যেন হৃদয়ের অনড় শিকড়
চাইলে উপড়ে ফেলা যায় না।
আমি সেগুলো বয়ে নিয়ে চলি
কখনও গোপনে কখনও প্রকাশ্যে।
এই বোঝা আজ আর ভার নয়
এ এক নির্জন নৌকা
যা ভাসিয়ে নিয়ে যায় আমাকে
নতুন স্রোতের দিকে।
আমার হাত এখন খালি
তবু পূর্ণ এক আশ্রয়ে
যেখানে আমি নিজেই নিজের আশ্রয়।
নিজেকে ভাঙতে গিয়ে
জেনেছি ভাঙা কাঁচেও
সূর্যের আলো খেলা করে।
আমি সেই আলোর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে
নিজের ছায়ার গভীরতা ছুঁয়েছি।
যতটা একা হয়েছি
ততটাই নিজের খোঁজ পেয়েছি।
এখন শুধু নিঃসঙ্গতার প্রতিধ্বনি শুনি
এ যেন আর বিষাদ নয়
এ আমার নিজের সঙ্গীত।
তীব্র নির্জনতার মধ্যে
যা থাকে—
তা আসলে আমার নিজের একান্ত আমি।
৪ নং কবিতা
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প
জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে
আমরা কিছু তো আঁকড়ে ধরতে চাই।
ভয়- হয় যদি হারিয়ে ফেলি
যা আজ নিজের মনে হয়
তা কি সত্যিই আমাদের চিরকালীন
সময় এসে বলে
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
গরমের এসি কি শীতে চালানো যায়
না তাতে শুধু শরীরই অসুস্থ হয় না
বিলের বোঝায় পকেটও হয় ফাঁকা।
সময়মতো থামতে হয়
শিখতে হয় বিদায় জানানো
কারণ—ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
শীতের লেপ গরমের পাখা
সময় ফুরিয়ে গেলে
তাদের জায়গা দিতে হয় নতুনকে।
যা ঋতুর নিয়মে চলে
তাতে থাকে প্রকৃতির সুরক্ষার পাঠ।
এবং প্রকৃতি প্রতিদিন শেখায়
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
দার্জিলিংয়ের পথে কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্রতা
যে মুগ্ধতা প্রতিদিন মনে জায়গা করে নেয়
তবু একদিন ফিরে আসতেই হয়।
শেষবার তাকিয়ে বলি
তোমার সৌন্দর্য হৃদয়ে রয়ে যাবে
তবু বিদায় জানাই
কারণ জীবন বলে
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
বসন্ত আসে রঙ ছড়িয়ে যায়
তবু বর্ষার প্রথম বৃষ্টি এসে তাকে বিদায় জানায়।
শরতের শুভ্র মেঘও কুয়াশায় ঢেকে যায় শীতে।
এই ঋতুচক্র আমাদের প্রতিদিন মনে করায়
প্রকৃতি নিজেও শিখিয়ে দেয়
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই পাঠ সত্য।
যে সম্পর্ক জোর করে আঁকড়ে ধরা হয়
তার শিকড় হয় দুর্বল
আর যা স্বাভাবিক নিয়মে বেড়ে ওঠে
তাতে থাকে অটুট বন্ধনের সৌন্দর্য।
তাই কখনো দূরত্ব এলে নিজেকে মনে করাই
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
পুরনো স্মৃতি অতীতের ব্যথা
এসব ধারণ করতে করতে
আমরা নিজেরাই হয়ে উঠি ভারী।
তখন প্রয়োজন হয় মুছে ফেলার
প্রয়োজন হয় জায়গা খালি করার।
কারণ যেখানে ব্যথা রয়ে যায়
সেখানেই অশান্তি বাসা বাঁধে।
আর আমরা বুঝি
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
একটি পুরনো বই যার প্রতিটি পাতায় হাতের ছাপ
তাকে সরিয়ে জায়গা করে দিতে হয় নতুন গল্পের
একটি পুরনো বাড়ি যেখানে হাজারো স্মৃতি
তাকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে যেতে হয় জীবনের প্রয়োজনে।
এই প্রতিটি বিদায় বলে দেয়
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
জীবন বারবার শিখিয়ে যায় এই পাঠ
প্রিয় মানুষ প্রিয় মুহূর্ত এমনকি প্রিয় জিনিসও
চিরকাল আমাদের সাথে থাকে না।
তাদের স্মৃতিকে সযত্নে রেখে
বিদায় জানাতে হয়
নতুনকে বরণ করার জন্য
এই বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের সৌন্দর্য।
তাই জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে
প্রকৃতি সম্পর্ক বা সময়ের সাথে
নিজেকে বলি
ছাড়তে শেখাটাও একটা শিল্প।
এই শিল্পে যত দক্ষতা অর্জন করি
জীবন তত সহজ হয়
তত সরল তত শান্তিময়।
৫ নং কবিতা
আলো ছায়ার গল্প
তুমি থেমে যাও অশান্ত পথিক
তোমার ভাঙা হৃদয়ের ধ্বংসাবশেষে
একটা নতুন স্বপ্নের জন্ম হোক
শান্ত নীরব আর দীপ্তিময়।
হে শোকের কালো মেঘ তুমি ঢেলে দাও
অশ্রুর বৃষ্টি নির্মল আর মধুর।
সেই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় ভিজে যাক
অন্ধকারে ঢেকে থাকা স্মৃতির মাটি
যেখানে কুঁড়ি ফোটাবে
নির্ভেজাল ভালোবাসার।
তোমার অন্তরের রক্তক্ষরণ
পথ খুঁজে পাক সৃষ্টির উষ্ণতায়।
যে ক্ষত একদিন কষ্টের আখ্যান বুনেছিল
আজ তারই গভীরতায় ফুটুক জীবনের আলো।
হে ক্লান্ত যাত্রী
তোমার বিবেকের অগ্নিকুণ্ডে
একটা কবিতার জন্ম হোক
নির্ভীক সুন্দর আর চিরকালীন।
তোমার যন্ত্রণার প্রতিটি স্পর্শে
জাগুক সৃষ্টি জাগুক শান্তির অর্ঘ্য।
সমাপ্ত
Leave a Reply