কবি পরিচিতিঃ কবি সালমা আক্তার ১২ জুলাই ১৯৮৯ সালে শরীয়তপুর জেলা, নড়িয়া উপজেলার আকসা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। লেখালেখি ও বই পড়তে খুব ভালোবাসেন তিনি। ফেসবুকে বিভিন্ন পেজ, ওয়েবসাইট এবং অনলাইন পত্রিকায় তার লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও ২০২১ এর ২১শে বইমেলায় দুইটি যৌথ কাব্যগ্রন্থে তার লেখা কবিতা রয়েছে। তিনি পেশায় একজন গৃহিণী।
১। বন্ধন
তুমি আঁকড়ে ধরো
তোমাকে আগলে রাখবো
তুমি জোৎস্না হয়ে থেকো
তোমার আলো গায়ে মাখবো।
তুমি দায়িত্ব নিও
তোমাকে যত্নে রাখবো
তুমি বৃক্ষ হয়ে যেও
লতা হয়ে জড়িয়ে থাকবো।
তুমি আদর দিও
তোমাকে ভালোবেসে যাবো
তুমি ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকো
তোমাতেই লেগে থাকবো।
সমুদ্রের নীল তিমি যেমন তিন মহাসাগর
ছুটে গিয়েছে তার সঙ্গীর খোঁজে
সেভাবে যদি ছুটে আসো
আমৃত্যু নয়
মৃত্যুর পরেও তোমাকে চাইবো।
২। ছাইটুকুন পাবে
আমার কাছে এসো না
ছাইটুকুন পাবে।
আমার সকল অসহায়ত্ব
নিঃসঙ্গ রাত্রির কাছে জমা রাখি।
গভীর রাতের প্রহরী হয়ে
আমাকে চাঁদের গল্প শোনাতে এসো না।
আমাকে যতটা দেখো হাস্যজ্জ্বল
ততটাই ভেতর ঘরের গভীরে ভস্ম।
সুতো কাটা ঘুড়িও তো আকাশে ওড়ে
দিগন্ত ছোঁয় সীমানা ছাড়ায়
অজানা গন্তব্যে সীমান্ত পেরিয়ে যায়
আমিও তেমন।
আমার কাছে এসোনা
ছাইটুকুন পাবে।
আমার কাছে এসো না ছাইটুকুন পাবে।
তোমাকে কেনার সাধ্য হয়ে উঠেনা
৩। তোমাকে কেনার সাধ্য হয়ে ওঠে না
আমাদের দেখা হতে পারতো
ফিলিস্তিনের যুদ্ধ বিরতির মধ্যকার সময়ে
বিপ্লব শেষে একটা ঘরও হতে পারতো
পৃথিবীর যা কিছু সুখ ছিল তা হতে পারতো।
অথচ আর দেখা হয় না কথা হয় না
বেখেয়ালের এক মিছিল নামে নয়াপল্টন ঘিরে
সেই ভীড়ে তোমাকে
দেখি আনমনে
আলু ভাতে ভাপের গন্ধের মতই তোমাকে টানে।
তোমাকে চাইতে গেলে
পৃথিবীর অর্ধেক দামে নিলাম উঠে
আমি দিকহারা পলাতক পথিক
তোমাকে কেনার সাধ্য হয়ে উঠে না।
বড় অবেলায় এলে তুমি
হেমন্তের স্নিগ্ধতার পরশে
নিবিড় ঝলমলে রোদের বেশে
তোমার আঁখি যুগলে বন্দি শিশিরের মুক্ত কণা
বুকের অলিন্দে শুভ্রতার মাদকতা।
কি করে বোঝাই
যে বুকে ঘর বাঁধবো সেই বুকে মরুভূমির চর
শতাব্দীর অন্ধকার ছেয়ে আছে
বুক পাজরে বহুদিন মুকুলের ঘ্রাণ ছড়ায়নি।
আমি মৃত্যুর আলিঙ্গনে আত্মমগ্নে
আগুন ললাটের খরতায় নিজেকে পুড়িয়েছি
এ বুকে শ্মশান পুষেছি ভষ্ম হয়েছি
গায়ে মেখেছি সেই ছাই।
বড় অবেলায় তুমি এলে
বলো তোমায় রাখি কোথায়
৪। অতঃপর
আমরা অপেক্ষা করি একসময় ভালো দিন আসবে
তারপর…
অপেক্ষাকৃত সময় উপেক্ষিত হয় সন্ধ্যা হয়
অন্ধকারের রং গাঢ় হয়।
তারপর…
ব্ল্যাক সার্কেল চোখের জ্যোতি কমে
মোটা ফ্রেমের চশমায় পাওয়ার বাড়ে
চুলের রং বাদামি থেকে সাদা হয়।
তারপর…
ফাকা মাঠে ঘাসে পূর্ণ
কালের বিবর্তনে জঙ্গলে জঙ্গল
বৃক্ষ নুয়ে নিচ্ছে খবর শতাব্দীর আয়ুষ্কাল।
তারপর…
চেনা নামের সজীব অবয়ব অচেনা নীলাম্বর
ঝড়ের খেতাব জ্বরের ঘোরে মেঘদূতের নিম্নচাপ
হেমন্ত জুড়ে নামবে শীত তবু কেন তার বর্ষা ভাব!
অতঃপর…
সু-দিনের অপেক্ষায় আমাদের দেখতে হয় সাইক্লোন।
৫। মায়ের নাম রেণু
মায়ের চোখে ডার্ক সার্কেল
কাজলের কৌটায় জমে আছে ধূলো
গাঢ় রঙের শাড়ি ব্লাউজের ভাজের বদলে দেখি
মলিন কাপড়ে শতেক স্বপ্ন আঁকা।
আমি দেখি মা আনমনা দৃষ্টিতে চাঁদের আলো উপভোগ করে
কে জানতো চাঁদের আলো নয় মা কারো অপেক্ষার জাল বুনছে
আমরা ভাইবোন অ, আ, ক, খ পড়ে ঘুমিয়ে পড়ি সন্ধ্যায়
মধ্যরাতে মা গলা ছাড়ে “তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে এএএএ”
ভোর রাতে হঠাৎ মায়ের ছোট্ট ঘরটিতে কেউ টোকা মারে..
রেণু, এই রেণু!
মায়ের গানের সুর বন্ধ হয়ে যায়
স্তব্দ হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ
চোখে মুখে অগ্নি জ্বালাপোড়া
আরও একবার রেণু ডাক শোনার অপেক্ষা
শুনলোও তাই।
মা দরজা খুলে
লজ্জা রাঙা মুখে বলে
অবেলায় তুমি!
তোমার গান শুনছিলাম দাঁড়িয়ে
‘ভীষণ মিষ্টি কন্ঠ তোমার
ঢাকা থেকে হঠাৎ চলে আসার কারণ হলো ভিসা চলে আসছে
শীঘ্রই চলে যাবো তোমাকে ওদের ভালো রাখার তাগিদে।”
আমি জেগে উঠি
ঘরভর্তি কমলা ফলের ঘ্রাণ পাই।
ছোটদের ঘুম থেকে তুলি “আব্বা আসছে”
তারপর…
তারপর মায়ের দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা
আব্বা এখন আর দরজায় টোকা মারে না।
ডাকপিয়নের সাথে মা রাখে দৈনিক যোগাযোগ
এই বুঝি আব্বার এলোমেলো হাতের লেখায় এলো বুঝি চিঠি।
চিঠি পেলে দেখতে পেতাম মায়ের চোখে মুখে উচ্ছ্বাসের ফোয়ারা
ফের চিঠির উত্তর লিখতে বসে মা।
তাতে প্রারম্ভীক প্রেমের উপমা যেন কোনো এক কবিকেও হার মানাতো
আমি যেন দুষ্টু মেয়ে চুপটি করে পড়ে নিতাম।
মায়ের চিঠির ভাজে উপচে পড়তো আব্বার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা শ্রদ্ধা আর ভরসা।

Leave a Reply