বিলায়েত হোসেন লিটন, বিশেষ প্রতিনিধিঃ ক্ষুধার কাছে এ পৃথিবী বড়ই নিষ্ঠুর, স্ত্রী সন্তানদের জন্য ভিটা ছেড়ে অজানা শহরে পাড়ি জমিয়েছেন ফরিদপুরের খোরশেদ আলম ও তার পরিবার।
ছেলে ভাত চাওয়ায় বাবার চোখে জল-ফরিদপুর রেলস্টেশনে একটি ক্ষুধার্ত পরিবার পশ্চিমের দিকে ঢলে পরা পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ফরিদপুর রেলস্টেশনের এক কোণে বসে আছে একটি ছিন্নমূল পরিবার।
যেন শহরের কোলাহলের মাঝেই হারিয়ে যাওয়া এক নিঃশব্দ গল্প। স্বামী খোরশেদ আলম কপালে হাত রেখে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সামনে, চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। পাশে তার স্ত্রী শাপলা বেগম, কোলে ক্ষুধার্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু যেখানে মায়ের শরীরেই যখন খাবারের অভাব, তখন সেই দুধও যেন যথেষ্ট হওয়ার নয় এটাই বাস্তব হওয়ার কথা।
বাবার পাশে বসে ছোট ছেলে শাওন, কাঁদতে কাঁদতে একমুঠো ভাত চায়। সেই আকুতি সহ্য করতে না পেরে অসহায় খোরশেদ আলম কখনো রাগে, কখনো হতাশায় ছেলেকে রাগারাগি করে যেন নিজের অসহায়ত্ব ঢাকতেই এই কঠোরতা। কিন্তু তার চোখের পানি বলে দেয়, তিনি ভেঙে পড়েছেন ভিতরে ভিতরে। ভাবনা শুধুই স্ত্রী সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
জানা গেল, অল্প কিছুদিন আগেও তাদের একটি ছোট্ট আশ্রয়স্থল ছিল শহরের লক্ষীপুর বস্তিতে। অভাব-অনটনের চাপে সেই আশ্রয়টুকুও হারিয়ে এখন তাদের ঠিকানা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। খোলা আকাশের নিচেই কখনো জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে রান্না করেন শাপলা বেগম, সেই রান্নার পাতিলের দিকে তাকিয়ে থাকে ক্ষুধার্ত সন্তানেরা, যেন প্রতিটি ফুটন্ত ভাতের দানাই তাদের কাছে পৃথিবীর সবচাইতে বড় স্বপ্ন।
তাদের গায়ে ধূলোমাখা ছেঁড়া কাপড়, আর ছোট্ট শিশুটির শরীরে সেটুকুও জোটেনি। অপুষ্টিতে শিশুদের শরীরের হাড়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-যা এক ভয়াবহ বাস্তবতার ছবি তুলে ধরে। সারাদিন না খেয়ে থাকা পরিবারটির দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায়, ক্ষুধা কেবল পেটেই নয়, তাদের জীবনটাকেই গ্লাস করে ফেলেছে। আর ক্ষুধা বড় যন্ত্রণাদায়ক বস্তুর নাম, তাই অনেক জ্ঞানীরা বা চলচ্চিত্র পরিচালকেরা নির্মাণ করে ছিলেন, এক মুঠো ভাত, এ পৃথিবী টাকার গোলাম, ক্ষুধা, ভাত দে চলচ্চিত্র।
সোমবার বিকেলে এই দৃশ্যটি চোখে পড়ে ফরিদপুর রেলস্টেশনে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখা গেলো একটি পরিবার কীভাবে নিঃশব্দে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। পরে সন্ধ্যায় আবার ফিরে এসে তাদের জন্য কিছু খাবার কিনে দিলেন সাংবাদিক হারুন অর রশীদ। মুহূর্তের জন্য হলেও তাদের মুখে ফুটে ওঠে একটুখানি স্বস্তির হাসি যেন পৃথিবীর সব সুখ ওই সামান্য খাবারের মাঝেই লুকিয়ে ছিলো।
কথা বলে জানা গেল, খোরশেদ আলম তার একমাত্র আয়ের উৎস রিকশাটিও মাত্র দুই হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। সেই টাকায় ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা-হয়তো নতুন কোনো কাজ, নতুন কোনো সুযোগের আশায়। ঢাকার উদ্দেশ্যে তারা ট্রেনের অপেক্ষায়। কিন্তু ঢাকায় গিয়ে কোথায় থাকবে, কীভাবে বাঁচবে-তার কোনো নিশ্চিত উত্তর ছিলোনা খোরশেদের কাছে।
শুধু নিজের ভিটার দিকে তাকিয়ে ছিলো আর অপেক্ষা ট্রেনের, উদ্দেশ্য অচেনা পীচ ঢালা পথ, লাল নীল বাতির শহর, বড় বড় ধনী ব্যক্তিদের দালানের শহর রাজধানী ঢাকা।
স্টেশনের কোলাহলের মাঝে পরিবারটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, একমুঠো ভাত-যেটা আমাদের কাছে খুব সাধারণ, সেটাই কারো কারো কাছে আজ অধরা স্বপ্ন। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মনে প্রশ্ন জাগে-এই পৃথিবীতে কি সত্যিই সবার জন্য সমান সুযোগ আছে?
সেই দৃশ্য, সেই ক্ষুধার্ত চোখ আর অসহায় কান্না-বারবার ফিরে আসে মনে। মনে হয়, পৃথিবীটা সত্যিই অদ্ভুত-কেউ অপচয়ে ডুবে থাকে, আর কেউ একমুঠো ভাতের জন্য লড়াই করে যায় প্রতিটি দিন।
অবশেষে ট্রেনের জন্য অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সন্ধ্যায় ঠিকই ফরিদপুরকে বিদায় জানিয়ে সেই ট্রেনেই চলে গেলেন খোরশেদ আলম ও তার পরিবার।
খোরশেদ আলমরা হয়তোবা আর কোনদিনই আসবেনা জন্ম ভূমি ফরিদপুরে। তবুও যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক তারা সারাটা জীবন।
Leave a Reply