সুজন বিপ্লব, বিশেষ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলায় কুমার নদের পাশে ছোট্ট একটি গ্রাম, নাম বাগুটিয়া। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জানে না তাদেরই গ্রামের একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এমন একজন বিপ্লবী। যাকে নিয়ে গর্ব করে সমগ্র বাংলা তথা ভারত উপমহাদেশ। ইলা মিত্র (১৮ অক্টোবর ১৯২৫ ১৩ অক্টোবর ২০০২) একজন ভারতীয় বাঙালি মহীয়সী নারী এবং সংগ্রামী কৃষকনেতা। তিনি মূলত তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সংগ্রাম করেছেন। যিনি অধিকার বঞ্চিত গণমানুষের বিপ্লব ও সংগ্রামের অনুপ্রেরণার উৎস। যার পর্বপুরুষের বসত ভিটে এখনো রয়েছে এই গ্রামে। এমনকি অধিকাংশ মানুষ জানে না, কখনো শুনেনি ‘ইলা মিত্রের’ নাম। এই বাড়িতেই শৈশব কাটিয়েছেন ইলা মিত্র।
গ্রামটির একটি প্রান্তে মাঠের মধ্যে ঘন জঙ্গলের ভেতর রয়েছে পাশাপাশি দুটো পুরনো বাড়ি। এলাকায় বাড়ি দুটোর একটি হাজী কিয়ামউদ্দীনের বাড়ি এবং অন্যটি হাফেজ সাহেবের বাড়ি নামে পরিচিত। হাজী এবং হাফেজ উভয়েই প্রয়াত, ফলে বাড়ি দুটোতে এখন বাস করে তাদের উত্তরাধিকারীরা। তারাই এই বাড়ি এবং সংলগ্ন কয়েকশত বিঘা সম্পত্তির মালিক। হাজী কিয়ামউদ্দীনের এই বাড়িটিতেই একদা বাস করতেন নগেন্দ্রনাথ সেন (এলাকার প্রবীণদের কাছে নগেন সেন নামে পরিচিত) ও মনোরমা সেন দম্পতি। নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বাংলার একাউন্ট্যান্ট জেনারেল। সরকারী চাকুরীর কারণে নগেন্দ্রনাথ সেনকে চলে যেতে হয় কোলকাতায়।
সেখানেই ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর জন্ম নেন ইলা। জন্মের পর যার নাম রাখা হয় ইলা সেন। আর এই শিশুটিই পরে হয়ে উঠেন বিপ্লবের সূতিকাগার, নাচোলের গণমানুষের ‘রানীমা’। নগেন্দ্রনাথ সেন যত দিন বেঁচে ছিলেন, মাঝে মাঝে আসতেন নিজ বাড়িতে। শৈশবে বাবার সাথে এসেছেন ইলা মিত্রও, থেকেছেন বেশ কিছু কাল এই প্রত্যন্ত পল্লীতে। ফলে বাড়িটি এই মহিয়সীর স্মৃতিবিজড়িত। নগেন্দ্রনাথ সেনের ছিল বিস্তর ভূ-সম্পত্তি। এই বাড়ির আশপাশের সব জায়গাই ছিল তার মালিকানাধীন। ভারত বিভক্তির পর তার গোমস্তা কালীপদ চক্রবর্তী বেশ কিছু সম্পত্তি নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেন। ওই সময়ে সুযোগ সন্ধানী কতিপয় মানুষ কালীপদ চক্রবর্তীর সহায়তায় হাতিয়ে নেয় বিপুল সম্পত্তি। কিছু জমি বিক্রি করেন নগেন্দ্রনাথ সেনের শাশুড়ি সরোদিনী সেন যদিও সরোদিনী সেন ওই জমির মালিক ছিলেন না।
পাকিস্থান আমলে বাদশাহ মিয়া নামে পুলিশের এক কর্মকর্তা হাতিয়ে নেয় বেশ কিছু জমি। সেখানে এখন মাছ চাষের জন্যে খনন করা হয়েছে দীঘি ও পুকুর। বাড়ির প্রাঙ্গনে গড়ে উঠেছে একটি মাদ্রাসা। জনশ্রুতি আছে, এই এলাকায় একসময় বাঘ ও টিয়া বসত করতো; তাই গ্রামের নাম হয়েছে বাগুটিয়া! তবে নগেন্দ্রনাথের এই বাড়িটি জনবসতি থেকে কিছুটা দুরে। সম্ভবত অধুনা বিলুপ্ত কন্যাদহ বা রাজা মুকুট রায়ের কিংবদন্তিঘেরা দোসতিনে বিলের ভেতর দিয়ে নৌপথে যাতায়াত করতেন বলেই জনবসতি থেকে দুরে বিলের কাছে বাড়ি করেছিলেন, এলাকার প্রবীনদের সাথে কথা বলে জানা যায়। নগেন্দ্রনাথ সেন একসময় নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে পার্শ্ববর্তী হাট ফাজিলপুর গ্রাম থেকে কিছু মানুষকে এনে নিজের বাড়ির পাশে বাড়ি তৈরি করে থাকতে দিয়েছিলেন। এখনও সেখানে একটি হিন্দু পরিবার রয়ে গেছে।
ঝিনাইদহের শৈলকূপার ভূমিকন্যা ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ির সঙ্গে প্রজন্মের কাছে বিস্মৃত তেভাগার ইতিহাস, কালের সাক্ষী পুরাকীর্তি ও প্রত্নসম্পদ হিসাবে স্বীকৃত উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামের রায়পাড়ার দ্বিতল ভবনের নয়টি কক্ষবিশিষ্ট কারুকার্যমণ্ডিত বাড়িটি অযত্নে-অবহেলা আর প্রশাসনিক উদাসীনতায় ধ্বংসস্তুপ্রায়। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী, উপনিবেশিক পাকিস্তানবিরোধী গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম সুহৃদ ইলা মিত্রের অবদান ইতিহাসের অমরগাঁথা। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সিপিবিসহ ইলা মিত্র স্মৃতি রক্ষায় স্থানীয় বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাড়িটিকে পুরাকীর্তি নিদর্শন ঘোষণা ও ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের প্রজ্ঞাপন জারি করার এক দশক পেরিয়ে গেলেও কোনরূপ কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত স্থান হিসাবেও কোন সরকারি সাইনবোর্ড পর্যন্ত বাড়ির আঙিনায় স্থাপন করতে পারেনি। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক উদ্যোগে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী কমরেড ইলা মিত্রের পৈতৃকভিটা রক্ষা ও তাঁর জন্ম-মৃত্যু স্মরণে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে দেখা যায়নি। ফলে বাড়িটির সঙ্গে কালের সাক্ষী কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস ও স্মারক স্থানটিও বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বসবাসরতদের দাবি ‘ক্রয় সূত্রে’ বাড়ির বৈধ মালিকানা রয়েছে। অবিলম্বে প্রখ্যাত এ কৃষকনেত্রীর বাড়ি রক্ষা করে দর্শনীয় স্থান তৈরিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন এলাকার সুধীসমাজ।
১৯৭০ সালের রেজিষ্ট্রি দেখিয়ে ‘ভুয়া কাগজপত্রে’ ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি দখল করে বসবাস করছে বলে অভিযোগ করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী শৈলকূপা শাখা সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক আলমগীর অরণ্য বলেন, অবিলম্বের প্রখ্যাত কৃষক নেত্রী কমরেড ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি রক্ষা করে ঐতিহাসিক ও পুরাকীর্তির দর্শনীয় স্থান বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
কিংবদন্তি নারী ইলার শৈশব-কৈশর সময় পার করা শৈলকূপার বাগুটিয়া, গোপালপুর, শেখরা, রঘুনন্দপুর, শাহাবাজপুরসহ কয়েকটি গ্রামে রয়েছে কয়েকশ বিঘা জমি। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন, মা মনোরমা সেন, দাদা রাজমোহন সেনের নামে রয়েছে এসব জমি। মূলবাড়িসহ বেশিরভাগ জমি ১৯৬৫ সালে ভিপি সম্পত্তি হিসেবে সরকারি খাতায় থাকলেও তার সবটুকুই এখন বেদখল। তবে ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, এসব সম্পত্তির ব্যাপারে সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি ও দুই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। এছাড়া মূল বাড়িটি দুদেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে বিনিময় হয়েছিল বলে ভূমি কর্মকর্তাদের কাছে কিছু কাগজপত্র জমা দিয়েছেন দখলদাররা। এদিকে ঝিনাইদহের জেলা আব্দুল আওয়াল জানান, ইলা মিত্রের বাড়িটি সংরক্ষণের বিষয়ে জ্ঞাত রয়েছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। জন্মশতবর্ষ এ বছর পালনের পূর্বে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি কমরেড ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি দখলমুক্ত করে সংরক্ষণের প্রত্যাশা এলাকাবাসীসহ সুধীজন সকলের।
কিংবদন্তি নারী ইলার শৈশব-কৈশর সময় পার করা শৈলকূপার বাগুটিয়া, গোপালপুর, শেখরা, রঘুনন্দপুর, শাহাবাজপুরসহ কয়েকটি গ্রামে রয়েছে কয়েকশ বিঘা জমি। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন, মা মনোরমা সেন, দাদা রাজমোহন সেনের নামে রয়েছে এসব জমি। মূলবাড়িসহ বেশিরভাগ জমি ১৯৬৫ সালে ভিপি সম্পত্তি হিসেবে সরকারি খাতায় থাকলেও তার সবটুকুই এখন বেদখল। তবে ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, এসব সম্পত্তির ব্যাপারে সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি ও দুই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। এছাড়া মূল বাড়িটি দুদেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে বিনিময় হয়েছিল বলে ভূমি কর্মকর্তাদের কাছে কিছু কাগজপত্র জমা দিয়েছেন দখলদাররা। এদিকে ঝিনাইদহের জেলা আব্দুল আওয়াল জানান, ইলা মিত্রের বাড়িটি সংরক্ষণের বিষয়ে জ্ঞাত রয়েছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। জন্মশতবর্ষ এ বছর পালনের পূর্বে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি কমরেড ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি দখলমুক্ত করে সংরক্ষণের প্রত্যাশা এলাকাবাসীসহ সুধীজন সকলের।
Leave a Reply