একতা ডেস্কঃ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কক্সবাজারে হাতির অভয়ারণ্যখ্যাত বিভিন্ন এলাকায়। আর চট্টগ্রামে আনোয়ারায় দেয়াং পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড)। ফলে হাতির বিচরণভূমি এসব এলাকা আর হাতির দখলে নেই। বাধ্য হয়ে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে বের হয়ে আসছে হাতি। আর মাঝে মাঝেই হাতির আক্রমণের মুখে পড়ছে সাধারণ মানুষ। গত এক মাসে আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে হাতির আক্রমণে চারজন মানুষ মারা যান। সন্ধ্যা হলেই বন্যহাতির আতঙ্ক ভর করে গোটা এলাকাজুড়ে। জানা গেছে, কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের অধীনে তিনটি ও উত্তর বনবিভাগের অধীনে উখিয়া-ঘুমধুম সীমান্ত এলাকায় পাঁচটি করিডোর আছে। এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসস্থল তৈরি করায় হাতির অভয়ারণ্য এলাকার বন-জঙ্গল নিশ্চিহ্ন করা হয়। ফলে হার্তিগুলো এখন চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী বিভিন্ন এলাকার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে আনোয়ারা-কর্ণফুলী দেয়াও পাহাড়ে আসছে। হাতির পাল এখন আনোয়ারা বৈরাগ, বটতলী, হাজীগাঁও এবং কর্ণফুলীর দেয়াং পাহাড়, হৃদ ও বন এলাকাজুড়ে বিচরণ করে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের অধীনে আছে চারটি করিডোর। এখানেও হাতির বিচরণের পরিবেশ নেই। এখানে কেইপিজেডসহ নানা স্থাপনা হওয়ায় নষ্ট হয়েছে হাতির বিচরণভূমি। ফলে হাতিগুলো খাবারের খোঁজ ও হাঁটতে লোকালয়ে চলে আসে। আনোয়ারায় কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর থেকে বন্যহাতি লোকালয়ে আসার ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ আছে। অতীতে দেয়াং পাহাড়ে হাতি স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করতে পারলেও এখন এই সুযোগ নেই। পরিবেশ সংগঠন গ্রিন ফিন্ডারের কো-ফাউন্ডার রিতু পারভী বলেন, বন্যহাতির খাবার নেই। বন উজাড় করে গড়ে তোলা হয়েছে শিল্পাঞ্চল। কিন্তু হাতির খাবার নেই কেন, তারা কেন লোকালয়ে আসে- এনিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। খাবার না পেলে হাতি খাবারের খোঁজে বের হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিষয়টা জানার পরও খাবারের ব্যবস্থা হয়নি কেন। কেইপিজেড হাতির বাসস্থানে শিল্প জোন করেছে। তাই তাদের দায়িত্ব আছে হাতির খাবারের ব্যবস্থা করার। তাছাড়া এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমও যথাযথভাবে কাজ করছে না। হাতিকে বিরক্ত না করলে কখনো আক্রমণ করে না। হাতি কেন আক্রমণ করছে এবং বন্যহাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে সব পরিষ্কার হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তাসনিম দিলশাদ বলেন, হাতি চলাচলের কিছু নির্দিষ্ট ট্র্যাক থাকে, আছে অভয়ারণ্য। এসব ট্র্যাক-অভয়ারণ্যে পরিবর্তন ঘটালে তারা লোকালয়ে চলে আসে। তাছাড়া, বনে হাতির খাবার থাকে। কিন্তু বন উজাড় হওয়ার কারণে খাবারের খোঁজেও হাতি লোকালয়ে চলে আসে। ইপিজেড এলাকায়ও এমন ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য দেশে হাতি চলাচলের ট্র্যাকে স্থাপনা করা হলে সেখানে ওভারপাস বা আন্ডারপাস করা হয়। দেশে এটা এখনো পুরোপুরি হচ্ছে না। তাই বন্যপ্রাণীর জায়গায় বসতি-বাণিজ্য স্থাপনা করলে হাতির বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বন্যহাতির আক্রমণে মানুষ মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে। তাছাড়া, পরিবেশ মন্ত্রণালয় একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটি সামগ্রিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রতিবেদন দেবে। আমরা প্রতিবেদনের সুপারিশ মতে কাজ করব। জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার দক্ষিণ শাহমীরপুর গ্রামের সুন্দরীপাড়া এলাকায় বন্যহাতির আক্রমণে মো. আকবর (৩৫) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়।
গত ২১ অক্টোবর চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প এলাকায় হাতির আক্রমণে হালিমা খাতুন (৬৫) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে বন্যহাতির আক্রমণে বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক আশ্রয়ণ প্রকল্পের খোশাল তালুকদারের বাড়ির মো. দুলাল (৬০) ও বৈরাগ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মো. আক্তারের স্ত্রী রেহানা বেগমের (৩৮) মৃত্যু হয়। এনিয়ে আনোয়ারার স্থানীয় বাসিন্দারা গত ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বরাবরে ‘কেপিজেডে অবস্থানরত বন্যহাতির অবস্থান পরিবর্তন দাবিতে’ একটি স্মারকলিপি দেন। তবে বন্যহাতির আক্রমণে মৃত্যুর বিষয়টি সামনে রেখে পরিবেশ মন্ত্রণালয় গত ২১ অক্টোবর কেইপিজেড এলাকার হাতি সুরক্ষায় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। কমিটিকে ইপিজেডের কর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে করণীয় বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন তিন সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়। জলদী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ সূত্রে জানা যায়, এখানকার বন্যহাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এই পথ ধরে চলাচল করে। তারা একবার যে পথ দিয়ে চলাচল করে, পরবর্তী সেই পথ ধরেই চলে। এতে বিঘ্ন ঘটলে তারা মারমুখী হয়। গাছপালা বেশি না থাকলেও এক সময় দেয়াং পাহাড়ে হাতি স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করতে পারত। কিন্তু এখন তা পারছে না। এ কারণে কিছুটা ক্ষুব্ধ তারা। একটি হাতি দৈনিক ১৫-১৬ ঘণ্টায় ৭০-৮০ কিলোমিটার হাঁটে। খাবার খায় প্রায় ১৫০ কেজি। সব মিলিয়ে হাতির জন্য বিশাল জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু তা এখন নেই। দেয়াঙ পাহাড়ে খাবার ও সুপেয় পানি পাওয়ায় চারটি হাতি অবস্থান নিয়েছে। এসব হাতিকে ঢিল ছোড়া, উত্ত্যক্ত করা কিংবা বিরক্ত করা হলে তারা মানুষকে আক্রমণ করে।
তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Reply