পরিচয়পঞ্জী
কবি, কথা সাহিত্যিক প্রবীর কুমার চৌধুরী। ১৯৬১ সালের মে মাসে জন্ম কলকাতার বরাহনগরে। শিক্ষা – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। পেশা – অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও যৌথ পরিবারের কর্তা। বর্তমানে গড়িয়া, কলকাতায় বসবাস করেন। কেজো পৃথিবী থেকে মুক্তি পাওয়ার অভিলাষে নাটক,গান, আবৃত্তি ও সামান্য সাহিত্য চর্চা। কখনও নিঃস্ব বাউলের মতো একতারায় বেজে ওঠা উদাসী গলায়। আবার
কখনও অধরা মধুরীতে ছন্দবন্ধনের খেলায় মেতে ওঠা প্রতিবাদের কবিতায়। দুইবাংলা থেকে বিভিন্ন সাম্মানিক পুরস্কার প্রাপ্তি । ২০১৭ সালে বিশ্ববঙ্গ বাংলা সাহিত্য একাডেমি থেকে কাব্যভারতী ও কাব্যশ্রী সম্মাননা, ২০১৯ এ হাইকু প্রভাকর সম্মাননা এবং ২০২০ সালে কলম সৈনিক কাব্যসুধা ও ভাষাসরিৎ কবিশ্ৰী সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। ২০২২ সালে কবি শঙ্খ ঘোষ স্মৃতি পুরস্কারও লাভ করেন তিনি। বর্তমানে চারিটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত:- ১) বেলা আবেলার গদ্য ও পদ্যের কাব্য ২) শুধু বুকের মাঝে থাকিস ৩) আরও একবার ফিরে আসতে চাই ৪) ভাঙ্গা পিঞ্জর ৫) প্রতিবাদীনি ( গল্প সংকলন ) এ ছাড়াও বহু যৌথ কাব্য সংকলনে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি।
প্রিয় গান – রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, ক্লাসিকাল, ঠুমরি প্রিয় অসুখ – মন খারাপ প্রিয় সুখ – স্মৃতিচারণ প্রিয় নেশা – ভালোবাসা
ছোটগল্প
গ্রেপ্তার
মোহরকুঞ্জে এইমুহূর্তে শীতের সন্ধ্যা ঝুপ করে নেমে এসেছে। পাখিরাও যে যার গাছবাসায় ফিরে এসেছে। স্বামী, সন্তান কাছে পেয়ে তারাও কলতান করছে হরষে । গাছের নিচে বসে সব মানুষ। যুগলে। কেউ বন্ধু, কেউ প্রেমিক, কেউ প্রেমিকা।
কেউ, কেউ একাকী, প্রকৃতির টানে। সত্যি
বলতে কি ভিক্টরিয়ার দিকের মোহরকুঞ্জের দিকে বড় নিরিবিলি, নিবিড় গাছ, পালায় ঘেরা অতীব মনোহর। আজ দেবী সেখানেই বসে আছে একা গভীর এক চিন্তাক্লিষ্ট মুখ নিয়ে। আশে পাশে সাঙ্গপাঙ্গরা হয়তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেডামের ডাকের অপেক্ষায়। আজ মাস খানেক হলো ইভটিজার দের দৈরাত্ব কলকাতাকে অস্থির করে তুলেছে । মেয়েরা শান্তিতে কোত্থাও কোন নিরিবিলি জায়গায় দুদন্ড বসতে পারছে না। কিছু ছেলে ভীষণ বিরক্ত করছে। রোজ সেই খবর সংবাদ পত্রে প্রকাশ হচ্ছে আর শহরময় সমালোচনার ঝড় বইছে। তাই প্রশাসন থেকে এই কেসের ভার ডিটেকটিভ ডিপার্মেন্ট থেকে লেডি ইন্সপেক্টর দেবী রায়কে দেওয়া হয়েছে।
দেবী আজ সিভিলে। জিন্সের উপর লাল টপ। হাতে গোল্ডেন ব্যান্ডের ঘড়ি, মাথায় টপনট চুল, চোখে সানগ্লাস। যেন একজন নায়িকা ক্যামেরায় পোজ দিচ্ছে। ইনফরমেশন যা আছে এখানেই বেশির ভাগ সন্ধ্যায় ইভাটিজাররা এসে মেয়েদের বিরক্ত করে। যতটুকু জানা গেছে তাদের মধ্যে এক ক্ষমতাশালী ব্যক্তির ছেলেও আছে। সেইনাকি বেশি বাড়াবাড়ি করে। কয়েকদিন আগে এক সন্ধ্যায় এক প্রেমিক যুগলকে আক্রমণও করে। এমন কি সেই ছেলেটির সামনেই মেয়েটির শ্লীলতাহানির চেষ্টাও করে। কিন্তু কয়েকজন প্রতিবাদ করায় তারা বিপদ বুঝে সরে পড়ে। বিশেষ করে শনিবার ও রবিবার নাকি তাদের হানা দেওয়াটা বেশি। তবে শুধু এখানেই নয়। কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় তাদের নষ্টামীর কথা শোনা গেছে এবং সিসি ক্যামেরায় তাদের সনাক্ত করাও হয়েছে। শীতকালের আকাশে পশ্চিমে সূর্য হেলে পড়ার সাথে, সাথেই পুব আকাশে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে।
চারিদিকে আঁধার নেমেছে। মশার
উপদ্রপে একে একে সবাই চলে গেছে বা যাচ্ছে।
এখন দেবী একা। ব্যাগ
থেকে ওডোমক্স বের করে দুইহাতে, পায়ের চেটো ও মুখে খানিক ঘষে নিলো দেবী মশার হাত থেকে নিস্তরের জন্যে। বিশেষ, বিশেষ অবস্থায় অপারেশনে বেরোনোর সময় পিস্তল, মোবাইল, ছোট্ট পেন্সিল টর্চের সাথে তাকে এগুলোও রাখতে হয়। ঠিক পাঁচটা পয়ত্রিশ। আধো অন্ধকারে দেবী দেখলো দুটো ছেলে সামনের রাস্তাটা দিয়ে চলতে, চলতে দেবীকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়লো । তারপর সহসাই দেবীর দিকে এগিয়ে এসে দুজনেই ওর পাশেই বসে পড়লো। মিনিট দুয়েক ছেলেদুটো নিজেদের মধ্যে কথা বলতে, বলতে দেবীকে জিজ্ঞাসা করলো সে কারুর জন্যে অপেক্ষা করছে কিনা। না বলায় তারা যেন একটু উৎসাহিত হলো। হটাৎ একটি ছেলে বিশেষ কাজ আছে বলে চলে যেতেই অপর ছেলেটি বলল – এখানে যা মশা বসার উপায় নেই। ছেলেটি ক্রমেই দেবীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করছে তা দেবীর বুঝতে বাকি রইল না। ছেলেটি নিজের নাম বলল। তারপর দেবীর পরিচয় জানতে চাইলো। দেবিও সঙ্গে, সঙ্গে ভুলভাল ইনফরমেশন দিল। মিনিট পনেরো পর ছেলেটি হটাৎ তাকে চায়ের আমন্ত্রণ জানালো। দেবী তো এটার জন্যেই এতক্ষন অপেক্ষা করছে। সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেল। ছেলেটি তাকে পার্কস্ট্রিটের একটি রেস্তোরায় নিয়ে এলো। একটা সুন্দর কুপে নিয়ে বসালো । চারদিক ঘেরা। ছয় বাই পাঁচ কূপটার আয়তন হবে । একটি সুন্দর টেবিল। তাকে ঘিরে চারটি চেয়ার। দেওয়ালে সুন্দর একটি মোনালিসার ছবি। টেবিলের উপর একটি অতীব সুন্দর ফ্লাওয়ারভাস তাতে নানা ধরনের সুগন্ধি ফুল একসাথে করে ভরা আছে। অদৃশ্য একটা স্পিকার থেকে খুব মৃদু টিউনিঙে মিউজিক চলছে। দেবাশীষ মেনুচার্ট দেখে ওয়েডারকে খাবার ও পানীয় দিতে বলল। ওয়েডার চলে যাবার পর দেবাশীষ তার স্থিরদৃষ্টি দেবীর চোখের উপর কিছুক্ষন রেখে বলল – একটা কথা বলবো রাগ করবে নাতো? যদিও তোমার সাথে আজই আমার আলাপ| কিন্তু প্রথম দেখাতেই আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। দেবী মনে, মনে বলল একটা বাচ্চা শুয়ার। তোমার ব্যবস্থা করছি দাঁড়াও। দেবাশীষ বলল “বিলিভ মি, আই লাভ ইউ। আই ওয়ান্ট মেরি উইথ ইউ, ডু ইউ এগ্রি উইথ মি ডেয়ার? একটু থেমে বলল” বিশ্বাস করো আমার টাকার অভাব নেই। আমি আমার বাবার বিশাল ব্যবসার একমাত্র পার্টনার। তোমায় রানী করে রাখবো। আমার বাবার নাম শুনলেও চমকে যাবে। ক্যাপিট্যালিস্ট বিজয় সাউ। হটাৎ দেবীর দুটি হাত ধরে দেবাশীষ বলল” আমি তোমায় ছেড়ে থাকতে পারবো না প্রিয়াঙ্কা। দেবী বুঝতে পারলো সে খুব উত্তেজিত এবং এ জায়গাটা তার শুধু চেনাই নয়। এখানকার ওয়েডারগুলোকে সে টাকায় কিনে রেখেছে। তাই দেবাশীষ না ডাকা পর্যন্ত সে কিছুতেই খাবার নিয়ে ঢুকবে না।
দেবী বলল, শান্ত হও তুমি। তোমার
চোখ মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। আমায় একটু চিন্তা করতে দাও। বাড়িতে গিয়ে একটু আলোচনা করি। তুমি একদিন আমার বাড়িতে এসো। সব দেখো|
দেবাশীষ বলল, কিছু দেখার নেই। তুমি মত দিলে আজকেই আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি। ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনসে আমার সুইটটি আজকেই তোমাকে দেখাবো চলো। ওখানেই তুমি ডিনার সেরে বাড়ি যাবে।
দেবী বলল, ধুৎ তা হয় নাকি। রাত হয়ে গেলে বাড়িতে চিন্তা করবে না! চলো ওঠা যাক। সাতটা বাজে। আরেক দিন আসবো।
দেবীর কথা শুনে দেবাশীষ কেমন কঠিন ও বেপরোয়া হয়ে উঠলো। বলল,
কিন্তু আমি যা চাই তা যে নিয়েই ছাড়ি। তার জন্যে ক্ষমতা প্রয়োগে আমি পিছুপা হইনা। তুমি তো আমায় চেনো না।
বলেই দেবীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। কিন্তু
দেবীর এক জুজুৎসুতে নকল দেবাশীষ ছিটকে পড়লো পেছন দিকে। দেবী বজ্র কঠিন স্বরে বলল, তুই আমাকে চিনিস না রতন সাউ। তোর মতো নরকের কীটকে মারতে একটার বেশি দুটো গুলি আমার খরচ হয় না।
বলেই দ্রুত তারদিকে রিভালবারটা তাক করলো। রতন সাউ এই অবস্থায় পড়বে কল্পানাও করতে পারেনি। কিছুক্ষন বিস্ফারিত চোখে দেবীর দিকে তাকিয়েই রইল। সে এতোই বিস্মৃত ও স্তম্ভিত যে উঠে দাঁড়াতেও ভুলে গেছে। কোনমতে তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞাসা করলোt
আপনি কে ম্যাডাম?
তোর যমুনা – ইন্সপেক্টর দেবী রায়।
বজ্র কঠিন গলায় বলল দেবী। তারপর
বিপ্লব বলে ডাক দিতেই সিভিলে দুজন পুলিশ কুপে ঢুকতেই দেবী অর্ডার করলো হ্যান্ডেকাপ পরিয়ে অতিথিকে থানায় নিয়ে যাও। এমন এমন কেস দেবে যেন কোনমতেই জামিন না পায়। আর নিয়ে গিয়েই আজকেই থার্ড ডিগ্রি দিয়ে সবার নাম জেনে নিয়ে সব কটাকে এরেষ্ট করবে। কালকেই সব কটাকেই কোর্টে চালান করবো। আরও একটা কথা বলে রাখি এই শয়তান অনেক মেয়ের সর্বনাশ করেছে। নিকৃষ্ট জীব। রাস্তায় বেশি ট্যান্ডাই ম্যন্ডাই করলে এনকাউন্টার করে দেবে। বলেই পাশ ফিরে মুচকি হেসে গট, গট করে বেরিয়ে গেল বিজয়িনীর মতো দেবী রায়।

Leave a Reply