কথা শুনে হাসি পায়। কিন্তু ভিষয়টি হাসির নয়, লজ্জার। বড় আশায় বুক বেঁধেছিল বাঙালি। যেদিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তোপের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ও দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন অন্য কোনো দেশে। এজন্য আশায় বুক বাঁধার বলছি যে, গণতন্ত্রের নামে সাধারণ মানুষের ওপর যে জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এতদিন, সেই জগদ্দল পাথরটি হয়তো এবার চিরতরে নেমে গেল। আসলে গণতন্ত্র মানে তো সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্খার কথা সরকার শুনবে আর সে মোতোবেক কাজ করবে। কিন্তু এখানে ঠিক তার বিপরীত পরিস্থিতি বিরাজ করে আসছে বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে। তা হলো জনগণের কথার কোন মূল্যই নেই। জনগণ কেবল সরকারের কথা শুনতেই বাধ্য। বিগত সরকারের আমলে রাস্তাঘাটে এমন হরহামেশাই খুন, ছিন্তাই, চাঁদাবাজির ঘটনা দেখা যেত না সত্য। তবে অন্যভাবে জনগণের পকেট কাটার খবর ছিল উল্লেখযোগ্য। ঘুষ, দুর্নীতির তো অন্ত ছিল না। বিপক্ষে কথা বললেই তাকে জঙ্গী আখ্যা পেতে হতো। এ কথা সত্য যে, জনগণের পক্ষের কথাগুলেই সরকারের বিপক্ষে চলে যায়। আর তখন ডিজিটাল আইনের আওতায় এনে মুখ বন্ধ করার নানা উপায় অবলম্বন করেছে বিগত আওয়ামী সরকার। ধর্মের নামে ধোয়া তুলে সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো হয়েছে অত্যাচার, হত্যা, অগ্নিসংযোগ এমনকি ধর্ষণের মতো অমানবিক ঘটনাও। এতকিছুর পরেও শেখ হাসিনা বলতেন কোথাও কোনো নাশকতা নেই। সব ঠিক আছে।
এসব কারণে দেশের ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে। পতনও হয়ে গেল বলা যায় চোখের পলকে। বিজয়ী ছাত্র-জনতা অন্তরবর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন বাংলার কৃতী সন্তান শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্ম ইউনুসকে। তিনিও সম্মতি জ্ঞাপন করে যথাসময়ে দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন প্রায় সাত মাস হয়ে গেল। এর মধ্যে আইন শৃঙ্খলার কোন অগ্রগতি তো নেই-ই, বরং ক্রমাবনতি অব্যাহত রয়েছে। দেশের পথেঘাটে দিনেরাতে মানুষ চলতে পারছে না। যে কেউ যখন তখন আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। প্রকাশ্যে মেয়েদেরকে উত্তপ্ত ও মারধর করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কুশপুত্তলিকা দাহ করছে। দেশের পরিস্থিতি কতটা খারাপ হলে সাধারণ মানুষ এমন নির্মম ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে! এতই বোঝা যায়, রাষ্ট্র এখন সেই জুলাই-আগস্টের অবস্থানে চলে গেছে। তারপরও অন্তরবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলছেন অপরাধ মোটেই বাড়েনি। আগের মতোই আছে।
কথাটা বলার আগে একবারও কি ভেবেছেন, আসলে তিনি কী বলছেন! সাত মাস পরে এসেও উনি বলছেন অপরাধ আগের মতোই আছে। যদি একথা মেনেও নিই, তাহলে শেখ হাসিনার দোষ কী ছিল! দেশের মানুষ তো চেয়েছিল সমস্ত বৈষম্য দূর করতে। বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তরতাজা তরুণেরা জীবন দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটালো। ক্ষয় ক্ষতি হলো দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো। ’২৪-এর শহীদেরা তো অপরাধ জিইয়ে রাখার জন্য জীবন দেয়নি। তাহলে সাত মাস পরেও এভাবে সিনা টান করে অপরাধ আগের মতোই আছে কথাটা বলার অধিকার কি কোন নূনতম বোধ সম্পন্ন ও দায়িত্ববান লোকের আছে! সংস্কার নামের মুলার আটি জনগণের সামনে ঝুলিয়ে রেখে আর কত ব্যর্থতার বুলি ঝাড়তে চান প্রধান উপদেষ্টা। এই সাত মাসে দেশের মানুষ তো বুঝতেই পারলো না কোথায় সংস্কার হলো, বা হচ্ছে।
সমস্যাটা এখানেই। সেই আগের মতোই। দেশের মানুষ দেখছে, বলছে ও দেখিয়ে দিচ্ছে অপরাধ বাড়ছে। অথচ সেই স্বৈরাচার সরকারের মতোই জনগণের কথার তোয়াক্বা না করে সরকার প্রধান বলছেন অপরাধ বাড়েনি। সাধারণ মানুষ যা দেখতে পাচ্ছে তা অবিশ্বাস করতে হবে সরকারের কথায়। জাগ্রত মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার অপকৌশল তো সেই বৈষম্যকেই চিইয়ে রাখার উপায়। এর পরেও কি দেশের মানুষ মুলার আটির দিকে তাকিয়ে বেসে থাকবে! এভাবে চলতে পারে না। শহীদদের রক্তে ভেজা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে দেয়া যাবে না, এটি সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবি। রাষ্ট্রের উচিত অতি দ্রুত গণমানুষের এই আকাঙ্খার দিকে নজর দেয়া।
নির্বাহী সম্পাদক
Leave a Reply