ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিকভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত ও শস্য-শ্যামলা, উর্বর মাটি দ্বারা গঠিত আর বন্যাসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের প্রকোপ থেকে অনেকটা মুক্ত ও প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঘনঘটাহীন পরিবেশ আশ্রিত অনন্য এক মুক্তাঞ্চল ঝিনাইদহ জেলা। অনেকাংশে প্রাকৃতিক দূর্যোগমুক্ত এ জেলায় নাগরিক জীবনে স্বস্তি থাকলেও উন্নয়নসূচকে পেছনের সারির তালিকাভুক্ত রয়েছে। বাঁওড়-এর রাজধানী ও জলাশয় বা জলের গ্রাম হিসেবে কৃষিপ্রধান ঝিনাইদহের অনুকূল পরিবেশ ও আবহাওয়ায় কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং শিল্পায়ন বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে বিশাল উৎপাদন ও দিগন্তজোড়া অর্থনীতির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রুপান্তর করতে পরিকবিরত ও উন্নত ঝিনাইদহ গড়তে জেলাবাসীর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনসমূহের উদ্যোগে দীর্ঘদিন বিভিন্ন দাবিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলন চলমান রয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে উন্নয়ন বঞ্চিত ঝিনাইদহের মানুষ এবার ন্যায্য হিস্যা পেতে চাই।
সভা-সমাবেশ, হাট-বাজার, চায়ের দোকান থেকে বৃহত্তর জনপরিসর ভাষ্যমতে, দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে ঝিনাইদহের ১২ নদ-নদীসহ খাল-বিল-বাঁওড়-খাস জলাশয় সুরক্ষা, ঝিনাইদহের ভূমিপুত্র বিপ্লবী বাঘা যতীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং আরেক বিপ্লবী ভূমিকন্যা ইলা মিত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, জেলা সদর ও উপজেলাসমূহে রেলপথ চালু, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও বেকারত্ব নিরসনে কর্মসংস্থান সেন্টার প্রতিষ্ঠা, বাঁওড়সহ জলমহাল ইজারা পদ্ধতি বাতিল ও জেলে-মজুর-ভূমিহীনদের সামাজিক মালিকানাসহ নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঝিনাইদহ গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবিলম্বে গণদাবিসমূহের বাস্তবায়ন দেখতে চায় এ জেলাবাসী। এসব দাবিতে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আন্দোলন চলমান রয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ঝিনাইদহ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক যোগাযোগ ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। জেলার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, কুষ্টিয়া বা যশোরে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ থাকলেও ঝিনাইদহ সবসময় অবহেলিত। জেলায় রেললাইন না থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহনে যেমন খরচ বাড়ছে, তেমনি আধুনিক চিকিৎসার অভাবে জটিল রোগীদের কুষ্টিয়া, যশোর কিংবা ঢাকায় স্থানান্তর করতে গিয়ে পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটে।
জানা গেছে, সাংবাদিক সুজন বিপ্লবের নেতৃত্বে প্রথম সংগঠিতভাবে ঝিনাইদহ জেলায় রেল লাইন, মেডিকেল কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, সমাবেশ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, ক্ষেতমজুর সমিতি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সিপিবিসহ রেললাইন, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই কর্মসূচিগুলো আয়োজন করে। তবে জেলাবাসীর গণদাবিতে পরিণত হলেও ইলা মিত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাঘা যতীন মেডিকেল কলেজ বা রেল সংযোগ আজও গড়ে ওঠেনি। বিগত সময়ে যারা জেলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে তাদের কেউই দাবিগুলো নিয়ে কোনো ভূমিকা রাখেননি। গত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে ‘রেললাইন, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন’সহ বিভিন্ন জনস্বার্থে লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচি- মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ এবং প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঝিনাইদহের রাজনীতিতে এবার উন্নয়নের এইসব ইস্যু ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করতে পারে। দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের আবেগ এই দাবিগুলোর সাথে জড়িয়ে থাকার জন্য এটি এখন বড় চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ, উভয়ই।
জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পূর্বাপর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও গণদাবিসমূহ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি না হওয়ায় সোচ্চার ঝিনাইদহবাসীর সাথে একাত্ম বিভিন্ন সংগঠনের নিয়মিত কর্মসূচি পালনকালে যেকোন সময়ে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি পাল্টে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিবর্গ।
Leave a Reply