মুন্সী হাবিবুল্লাহঃ শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। বাতাসে উৎসবের আগমনী সুর। দূর থেকেই কোথাও ভেসে আসছে হাতুড়ির শব্দ, কোথাও মাটির গন্ধ। পূজামণ্ডপে মণ্ডপে বাঁশ-খড়ের কাঠামোর ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে দেবী দুর্গার অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত কারিগররা। সকাল থেকে রাত-সময় যেন তাঁদের কাছে এখন কেবলই প্রতিমা তৈরির। শারদীয় দুর্গাপূজা যত এগিয়ে আসছে, মাগুরার শালিখায় ততই বাড়ছে এই কর্মযজ্ঞের ব্যস্ততা।
উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, কোথাও প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ শেষ হয়েছে, কোথাও চলছে মাটির শেষ প্রলেপ। কোনো মণ্ডপে আবার শিল্পীর নিপুণ তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে দেবীর মুখাবয়ব। কাঁচা মাটির সাদামাটা কাঠামো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে রঙিন ও নান্দনিক প্রতিমায়। কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় মাটি যেন প্রাণ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়।
বাঁশ-খড় থেকে দেবীর অবয়ব
প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় বাঁশ ও খড় দিয়ে কাঠামো তৈরির মধ্য দিয়ে। এরপর বিশেষভাবে প্রস্তুত মাটি দিয়ে কয়েক ধাপে তৈরি করা হয় প্রতিমার শরীরের অবয়ব। মাটি শুকিয়ে গেলে চলে সূক্ষ্ম কারুকাজ। মুখমণ্ডল, চোখ, হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গের নিখুঁত গঠন ফুটিয়ে তোলার পর দেওয়া হয় রঙের প্রলেপ। সবশেষে শাড়ি, অলংকার, চুল ও সাজসজ্জায় পূর্ণতা পায় দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য প্রতিমা।
একটি প্রতিমার এই পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে সময় লাগে বেশ কয়েক দিন। এর পেছনে থাকে কারিগরদের দীর্ঘ পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা ও শিল্পীসত্তা। বিশেষ করে প্রতিমার মুখাবয়ব তৈরিতে তাঁদের দিতে হয় বাড়তি মনোযোগ। কারণ চোখ-মুখের অভিব্যক্তিতেই ফুটে ওঠে প্রতিমার সৌন্দর্য ও প্রাণবন্ততা।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত কারিগররা
শালিখা উপজেলার চুকিনগর বারাঙ্গা খাল পূজামণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত ভাস্কর নিরঞ্জন সরকার। তিনি জানান, পূজার সময় যত ঘনিয়ে আসে, কাজের চাপও তত বেড়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাও কাজে সহযোগিতা করেন।
নিরঞ্জন সরকার বলেন, প্রতিমা তৈরি শুধু মাটি দিয়ে একটি অবয়ব তৈরি করা নয়। এর প্রতিটি ধাপে শিল্পীর চিন্তা, দক্ষতা ও যত্ন জড়িয়ে থাকে। সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপ থাকলেও প্রতিমা সুন্দরভাবে তৈরি করতে কোনো পর্যায়েই তাড়াহুড়া করার সুযোগ নেই।
মণ্ডপে মণ্ডপে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
শুধু প্রতিমা তৈরিই নয়, শালিখার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য প্রস্তুতিও। আয়োজকরা বলছেন, উৎসবকে আনন্দমুখর ও শান্তিপূর্ণ করতে নেওয়া হচ্ছে নানা প্রস্তুতি। পূজার দিন যত এগিয়ে আসবে, মণ্ডপগুলো ততই জমে উঠবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, দুর্গাপূজা এখন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি শালিখার মানুষের সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যেরও অন্যতম বড় উপলক্ষ। পূজার সময় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ।
মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ভালোবাসা
দিন-রাতের পরিশ্রমে ক্লান্তি থাকলেও কারিগরদের চোখেমুখে দেখা যায় তৃপ্তির ছাপ। তাঁদের কাছে প্রতিমা তৈরি কেবল জীবিকা নয়-এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা শিল্প ও ঐতিহ্যের অংশ।
মাটির সঙ্গে মিশে থাকা তাঁদের শ্রম, ঘাম ও ভালোবাসা যখন পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গার পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়, তখন সেই মুহূর্তই যেন তাঁদের সব ক্লান্তির অবসান ঘটায়। শরতের নীল আকাশ আর সাদা মেঘের নিচে শালিখার জনপদে তাই এখন প্রতিমা তৈরির প্রতিটি আঘাতে, প্রতিটি তুলির আঁচড়ে শোনা যাচ্ছে আসন্ন দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা।
Leave a Reply