হিমাংশুদেব বর্মণ
মাগুরার নেতা থেকে বাংলাদেশের নেতা। বিশিষ্ট বোদ্ধাজনেরা এমনটিই মনে করছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি দেখে। ‘২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের প্রবাস জীবনে আজ পর্যন্ত তালিকাভূক্ত কোনো বড় নেতা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা বলেননি। যেখানেই থাকুন না কেন অন্তত ভিডিও বার্তাতে কিছু বলার চেষ্টা করেননি। এমন কী দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তিনিও এখন পর্যন্ত টু-শব্দটিও করলেন না। দেশের সাধারণ মানুষের কথা ছেড়েই দিলাম দলের ছোট বড় নেতা কর্মীদের মনোবল অটুট রাখার জন্য তো দু-চারটে কথা বলা যায়। তাও তিনি বলেননি। তার এহেন আচরণ দেখে মনে হচ্ছে অনানুষ্ঠানিকভাবে তিনি রাজনীতি থেকেই স্বেচ্ছায় নির্বাসনের পথ বেছে নিয়েছেন। তাহলে দলের হাল ধরবে কে? সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে কাউকে না কাউকে তো অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে। কেবল ওই মোদী, শুভেন্দু কী বলছেন, ওই ভরসায় বসে থাকলে তো দল চলবে না। ভেতরে ভেতরে যদিও প্রস্তুতি থাকে তবুও প্রকাশ্যে একটা ভূমিকা থাকতেই হবে। এরকম মনোভাব আপাতত তেমন কারো আছে বলে দৃষ্টিগোচর হয় না। তবে এ ক্ষেত্রে নেতা বলে অখ্যাত অবহেলিত এমন একজন ব্যক্তিকেই মাঝে মধ্যে দেখা যাচ্ছে তিনি দলের নেতা কর্মীদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলছেন। সোস্যাল মিডিয়ায় তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু পোস্ট দেখা যাচ্ছে। তিনি হলেন এ্যাড. সাইফুজ্জামান শিখর।
এই সাইফুজ্জামান শিখর সম্বন্ধে মানুষ যা জানে, তা হলো ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন আওয়ামী লীগের ত্যাগী, নির্যাতিত এবং পরিক্ষীত নেতা। জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিপদের আশঙ্কা দেখে সব নেতারা কেটে পড়লেও তিনি গণভবনেই ছিলেন। গণভবন ও সচিবালয় এলাকায় দপ্তরে দপ্তরে ঘুরেছেন তিনি সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজতে। যদিও তা নিয়ন্ত্রেণের বাইরে চলে গিয়েছিলো অনেক আগেই। শেখ হাসিনার ক্ষমতা থেকে অপসারনের পুরো সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবেই নেয়া হয়েছিলো। যা হোক, সেদিকে না যাই এখন।
আগে তার পরিচয়টা এখানে জরুরী। এই সাইফুজ্জামান শিখর একজন বনেদি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার পিতা এ্যাড. আসাদুজ্জামান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন শেখ মজিবুর রহমানের অত্যন্ত নিকটজন এক মুক্তিযোদ্ধা। তিনি তার সহচর ছিলেন বলে উল্লেখ করলেও ভুল হয় না। স্বাধীন বাংলাদেশের সব কয়টি জাতীয় নির্বাচনে মাগুরা-২ আসনে নির্বাচিত অপরাজিত সাংসদ ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পরে তবেই আসনটি অন্য দলের দখলে চলে যায়। ‘৯৪-এর উপনির্বাচনে সাইফুজ্জামান শিখরের বড় ভাই শফিকুর রহমান বাচ্চু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে হেরে যান। সে নির্বাচন কেমন হয়েছিলো তা এখন না-ই বা বললাম। ওটা সবারই জানা। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনেও তাকে প্রার্থী করা হলে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে আসনটি আবার বিরোধী শিবিরে চলে যায়।
দলের এই বিভাজনের মূলে যিনি ছিলেন তিনি পাক্বা সুবিধাবাদী শ্রেনীর একজন রাজনীতিক। গোড়া থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসেননি। সবচেয়ে বড় কথা হলো যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, সেই নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের ঘোর বিপরীত ঘারানায় ছিলেন। বাঘ মার্কার প্রর্থীর হয়ে কাজ করেছেন। তিনি নির্বাচনী বুথে বাঘ মার্কার এজেন্টও ছিলেন। তারপর দেশ স্বাধীন হলো, শেখ মজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। তখনও তাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দেখা যায়নি। এরশাদ শাহীর আমলে যখন উপজেলা নির্বাচন শুরু হলো, তখন এই বসন্তের কোকিলকে দেখা গেলো আওয়ামী লীগে। ওই ব্যক্তি পরবর্তীতে সংসদ নির্বাচনের স্বপ্ন পূরণ করতে এই ত্যাগী পরিবারের বিরুদ্ধে কাজ করতে লাগলেন অতি সতর্কতার সাথে। তিনি তার স্বপ্ন পুরণ করেছেন। তবে দলের জন্য কোনোদিন কোনো ঝুঁকি নিয়ে সামনে দাঁড়ানিনি। বিরোধী শিবিরের সাথে তেলেসমাতি করে চলে আসছেন এই পর্যন্ত। যার ফলে রাজনীতির কারণে বিরোধী শিবিরের কাছে কোনোদিন একটা কটু কথাও শোনেনি তিনি।
আর এতটা সময় ধরে সাইফুজ্জামান শিখর ছিলেন ছাত্র। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়াশোনা করাকালে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় হামলা মামলা উপেক্ষা করে নেত্রীকে সম্বর্ধনা জানাতে সামনে দাঁড়িয়ে তাকে প্রথম সালাম জানিয়েছিলেন যতটা আমার জানা আছে। পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের আমলে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন, মার খেয়েছেন, জেল খেটেছেন। তারপরও দল ছাড়েননি। কারণ পিতা এ্যাড. আছাদুজ্জামান তার পরিবারকে আওয়ামী পরিবার হিসেবেই গড়ে তুলেছেন। এতটা ত্যাগ স্বীকার করে রাজনীতিতে বিশেষ অবদান ও দক্ষতার কারণে নেত্রী তাকে তার এপিএস পদে নিয়োগ দিলেন। কিন্তু এপিএস হয়ে ঘরবন্দী হয়ে থাকাটা তার কাছে ভাল লাগেনি। তিনি চেয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচরণ করতে। দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তাই তিনি নিজের এলাকা দিয়েই সেবার কাজ শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুমতি চাইলেন সংসদ নির্বাচন করতে। প্রধানমন্ত্রী তাকে সম্মতি দিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-১ আসনে নির্বাচন করার জন্য মনোনীত করলেন সাইফুজ্জামান শিখর ভাইকে। তিনি নির্বাচিত হয়ে সংসদে গেলেন মাগুরাবাসীর জনপ্রতিনিধি হয়ে। তার চার বছরের জনপ্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে সফলতা দেখে সুবিধাবাদী চক্র শুরু করে দিলো চক্রান্ত। প্রধানমন্ত্রীকে নানাভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সাইফুজ্জামান শিখরকে বাদ দেয়া হলো মনোনয়ন তালিকা থেকে। ক্রিকেট মাঠ থেকে টেনে ধরে আনা হলো সাকিব আল হাসানকে। যে কোনোদিন রাজনীতি কী তা বোঝার চেষ্টাও করেনি।
হঠাৎ এভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েও সাইফুজ্জামান শিখর আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এতটুকু মনোক্ষুন্ন হননি। অনেকে অনেক বোঝানো সত্বেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করলেন না। তিনি বললেন প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমাকে মনোনয়ন দেননি, তাতে কী হয়েছে। রাজনীতি করতে তো নিষেধ করেননি। সংসদে না-ই বা গেলাম। মাঠে থেকে রাজনীতি করবো। তিনি করলেনও তাই। ‘২৪ সালের মার্চ-এপ্রিলের স্থানীয় নির্বাচনের সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর স্থলাভিসিক্ত হয়ে মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
অবশেষে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলো, তখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর পাশে থেকে পরামর্শ দিয়েছেন। দপ্তরে দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। যদিও সে চেষ্টা বিফলে গেছে। তারপর যা হবার তা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলো। বড় বড় নেতারা আগেই পালিয়ে গেলেন। মাগুরাতে তার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হলো। এটা নিতান্তই রাজনৈাতক প্রতিহিংসার কারণ। অবশ্য সুবিধাবাদী চক্রের মূল নেতাদের বাড়িও পুড়িয়েছে। তবে তা তাদের দুর্নীতি এবং একছত্র আধিপত্য বিস্তারের কূফল ছিলো। সাইফুজ্জামান শিখর ঢাকাতেই থাকলেন(আত্মগোপনে)। যতটা জানা আছে ছয় মাস যাবৎ ঢাকাতে থাকার পর অত্যন্ত নিরাপদে দেশত্যাগ করেন তিনি। এই ছয় মাস তিনি গোপনে দেশে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছেন। আবার দিন আসবে বলে তাদের দৃঢ় মনোবল ধরে রাখতে চেষ্টা করেছেন। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই তিনি সোস্যাল মিডিয়ায় মাঝে মধ্যেই বার্তা দিয়ে সরব থাকছেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসে থেকেই সম্ভাবনাময় নেতাদের সাথে সাক্ষাতের প্রথম দফায় ডেকেছেন জাহাঙ্গীর কবির নানককে সপরিবারে। দ্বিতীয় দফায় ডেকেছেন সাইফুজ্জামান শিখরকে। তিনিও সপরিবারে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। দেখাও করেছিলেন সপরিবারেই। তার আগে থেকেই তিনি সোস্যাল মিডিয়ায় সরব আছেন তিনি। তার এই নেত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন এবং সোস্যাল মিডিয়ার উপস্থিতিই বারবার বোদ্ধাজনদের মনে আশা জাগাচ্ছে যে, মাগুরার নেতা এখন সারাদেশের নেতা হতে চলেছে।
নির্বাহী সম্পাদক
Leave a Reply