একতা ডেস্কঃ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক চীন সফরে গিয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার্স (উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য) নিয়ে কিছু মন্তব্যে করেছিলেন। তা নিয়ে এখন দেশটির বিভিন্ন মহলে তোলপাড় চলছে। তাদের কেউ ওই মন্তব্যকে বলেছেন ‘আক্রমণাত্মক’, কেউ বলেছেন ‘বিপজ্জনক’, কেউ কেউ ‘বিস্ময়’ ও ‘হতাশা’ প্রকাশ করেছেন।
গত ২৬ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত চারদিনের চীন সফর করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি এ সময় বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাণিজ্য ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নেপাল ও ভুটান স্থলবেষ্টিত দেশ, যাদের কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের সাতটি উত্তরপূর্ব রাজ্যও স্থলবেষ্টিত। আমরাই এই অঞ্চলের জন্য সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক। তিনি এসব দেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ওপর জোর দেন, যা বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বেইজিংয়ে ড. ইউনূস এই ‘সাত রাজ্য’র কথা উল্লেখ করার কারণেই নাখোশ হয়েছেন ভারতের রাজনীতিক ও নীতি-নির্ধারক মহল। প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাত রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যাল, বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্রফুল বকশী, ত্রিপুরার টিপরা মোথা পার্টির প্রধান প্রাদ্যত মানিক্য, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা পবন খেরা প্রমুখ।
প্রধান উপদেষ্টার ওই বক্তব্যের বিষয়ে নিজের এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, “ড. ইউনূসের সেভেন সিস্টার্সকে স্থলবেষ্টিত বলে উল্লেখ করা এবং বাংলাদেশকে মহাসাগরের এই অঞ্চলের একমাত্র অভিভাবক হিসেবে স্থান দেওয়া আপত্তিকর এবং কঠোরভাবে নিন্দনীয়। এই মন্তব্য ভারতের কৌশলগত ‘চিকেনস নেক’ করিডোর বিষয়ক স্থায়ী দুর্বলতার বয়ানকে তুলে ধরেছে। মোদীর উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল তার এক্স পোস্টে ড. ইউনূসের এই মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগকে স্বাগত। তবে ভারতের সাতটি রাজ্যের স্থলবেষ্টিত হওয়ার সঠিক তাৎপর্য কী?
ড. ইউনূসের মন্তব্যে স্তম্ভিত হয়েছেন জানিয়ে ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের এই মন্তব্য খুবই বিস্ময়কর (ভেরি শকিং)। এমন মন্তব্য করার একেবারেই কোনো অধিকার নেই তার। তিনি ভালো করেই জানেন যে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমরা বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার নিয়ে নিবিড় আলোচনা করেছি, এবং এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তিও রয়েছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ বিভিন্ন মহল বেজায় অসন্তোষ প্রকাশ করলেও ভারত সরকার ড. ইউনূসের এই মন্তব্যের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থান ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত সাতটি রাজ্যের। এগুলো হলো ত্রিপুরা, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশ।
এর মধ্যে অরুণাচল প্রদেশের বিশাল এলাকা নিয়ে চীন ও ভারতের বিরোধ দীর্ঘদিনের। উভয়পক্ষই সেসব এলাকা নিজেদের দাবি করে। এমনকি চীনের মানচিত্রে অরুণাচল প্রদেশের অবস্থানও প্রকাশ পেয়েছে, যা নিয়ে ভারতের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে অতীতে। আর মণিপুর, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডে বিভিন্ন সময় স্বাধীনতার দাবিতে বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন দেখা গেছে। এসব আন্দোলন দমনে ভারত সরকারের কড়া পদক্ষেপে সেখানে নানা সময় প্রাণঘাতী সহিংসতাও হয়েছে।
‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে ড. ইউনূসের মন্তব্যের প্রশংসা দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অনেকে বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত সুযোগ নিয়ে দেশের বাণিজ্যিক সুবিধার স্বার্থ মাথায় রেখে তিনি এ কথা বলেছেন।
ড. ইউনূসের ওই বক্তব্যের একটি ভিডিও শেয়ার দিয়ে মো. ইয়াসিন কবির নামে একজন তার ফেসবুকে লিখেছেন, আমাদের আরেকজন নেতা দেখান যিনি তার মতো এভাবে কথা বলতে পেরেছেন।
Leave a Reply