একতা ডেস্কঃ মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ফাতিমা জাহরা আল মানসুরিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। ২৩ সেপ্টেম্বরের সংসদীয় নির্বাচনে তাঁর দল অথেন্টিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (প্যাম) সর্বোচ্চ আসন পাওয়ার পর মঙ্গলবার তাঁকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৩৯৫ আসনের পার্লামেন্টে প্যাম পেয়েছে ৯৭টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৯৮টি আসন। ফলে এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ না থাকায় প্যামকে অন্য দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে হবে।
৫০ বছর বয়সী আল মানসুরি পেশায় আইনজীবী। বর্তমানে তিনি মারাকেশের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে জাতীয় ভূখণ্ড পরিকল্পনা, নগর পরিকল্পনা, আবাসন ও নগর নীতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালে প্রথমবার মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর আবারও মেয়রের দায়িত্বে ফেরেন।
২০০৮ সালে প্যাম প্রতিষ্ঠার পর দলটির সঙ্গে যুক্ত হন আল মানসুরি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দলটি কোনো একক মহাসচিবের পরিবর্তে যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এই যৌথ নেতৃত্বের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আল মানসুরি।
নির্বাচনের পর সরকারপ্রধান হিসেবে আল মানসুরি এবং দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ফৌজি লেকজার নাম আলোচনায় ছিল। শেষ পর্যন্ত রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ আল মানসুরিকেই বেছে নেন। মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের মধ্য থেকেই রাজা সরকারপ্রধান নিয়োগ করেন।
নিয়োগ পাওয়ার পর আল মানসুরি বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। একই সঙ্গে এটিকে মরক্কোর সব নারীর জন্য গর্বের বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নির্বাচনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে একজন নারী সরকারপ্রধানের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। সরাসরি উত্তর না দিয়ে আল মানসুরি রাজাকে নারীদের সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাজা প্রজ্ঞার আধার এবং সরকারপ্রধানের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করা হলে তা হবে অত্যন্ত সম্মানের।
আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা আল মানসুরি রাবাতের মোহাম্মদ পঞ্চম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা ও করপোরেট আইনে উচ্চতর শিক্ষা নেন।
রাজনীতিতে নারী অধিকার ও লিঙ্গ বৈষম্যের মতো বিষয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম প্রকাশ্যে কথা বলেছেন আল মানসুরি। মরক্কোতে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা এবং উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের মতো বিষয় নিয়ে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
নিজেকে ‘লৌহমানবী’ হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করেছেন আল মানসুরি। ২০২১ সালে প্যামের একটি সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে ‘স্বাধীন কর্মী’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
নির্বাচনে প্যাম সর্বোচ্চ আসন পেলেও এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস (আরএনআই) পেয়েছে ৬৬টি আসন এবং ইস্তিকলাল পার্টি পেয়েছে ৬৫টি। ইসলামপন্থী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) পেয়েছে ৫৪টি আসন। ২০২১ সালে দলটি ১৩টি আসন পেয়েছিল।
পিজেডির নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবদেলিলাহ বেনকিরান জানিয়েছেন, তাঁর দল প্যামের সঙ্গে কোনো অংশীদারিত্বে যাবে না এবং বিরোধী দলে থাকবে। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্যামকে অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে।
মরক্কো একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। নতুন সরকারের সামনে জোট গঠনের পাশাপাশি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জনসেবার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে।
Leave a Reply