মুন্সি হাবিবুল্লাহঃ ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়”-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মাগুরার শালিখায় জাতীয় কন্যাশিশু দিবস-২০২৬ উদযাপন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারীশিক্ষার প্রসার এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। পরে উপজেলা পরিষদের হলরুমে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন শালিখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, নারী সংগঠনের সদস্য এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
সভায় বক্তব্য দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম সাব্বির হাসান, জেলা বিএনপির সদস্য মুন্সি মনিরুজ্জামান চকলেট, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শাহরীন সুলতানা, দৈনিক একতার সম্পাদক মুন্সী হাবিবুল্লাহ, শালিখা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শহীদুজ্জামান চাঁদ, মহিলা দলের সদস্য রুনা সালাম এবং শিক্ষার্থী মারিয়াম বিশ্বাস মিম।
বক্তারা বলেন, কন্যাশিশুরা পরিবার, সমাজ ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাদের যথাযথ শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তারা ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। কিন্তু বাল্যবিবাহ, সামাজিক কুসংস্কার, বৈষম্য এবং শিক্ষার সুযোগের অভাব অনেক সময় কন্যাশিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তাঁরা আরও বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ শুধু প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কোনো কন্যাশিশুর বাল্যবিবাহের ঝুঁকি দেখা দিলে তা প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপরও জোর দেন বক্তারা।
আলোচনায় কন্যাশিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ঝরে পড়া রোধ, উচ্চশিক্ষায় উৎসাহ প্রদান এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়। বক্তারা মনে করেন, একটি শিশুর স্বপ্ন পূরণের পথ যেন বয়স, লিঙ্গ কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বক্তারা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য না করে উভয়ের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কন্যাশিশুর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা গেলে তারাই আগামী দিনে নেতৃত্ব, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন পেশায় নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাসলিমা বেগম। তিনি কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গড়তে সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আলোচনা সভা শেষে আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী নিতিশা শিকার, ফারিয়া তাসমিম ও পার্থদেব রায়ের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনা বিকাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের আরও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং শিক্ষার মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন উপস্থিত ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা গেলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
Leave a Reply