বাংলার মাঠে মাঠে জেগে উঠেছে রংচড়া ধানের আগা। মৌ মৌ গন্ধে এখনো ভরে ওঠেনি কৃষকের উঠোন। বাংলার পথে পথে এখনো ছড়ানো হয়নি টুকরো টুকরো সোনা। এই সোনার টুকরো ধান ঘরে তুলতে এখনো কৃষকের গায়ের ঘাম শুকালো না। আরো মেঘের আনাগোনা দেখেই বুক কেঁপে উঠছে আর শুকিয়ে যাচ্ছে গলা। ক্ষেতের ধান ঘরে ঠিকঠাক উঠবে কি উঠবে না তার কোন নিশ্চয়তা পাওয়া গেল না এখনো। এর মধ্যেই চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার আগাম ঘোষণা পাওয়া গেল সরকারের পক্ষ থেকে।
সরকারের চমৎকার ভাবনা আমাদের দেশের কৃষকদের নিয়ে। শীত মৌসুমে সবজির বাম্পার ফলনে সবজি চাষিরা কী পেল! একটিবার ভেবে দেখার সময় হয়েছে কারো! ওই যারা দেশ পরিচালনার গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বসে আছেন এসি রুমে! তারা কি ভেবে দেখেছেন এই সবজি চাষ করতে চাষির কত মূল্য দিতে হয়েছে, আর্থিক আর কায়িক! কতটা ঘাম ঝরাতে হয়েছে তার শরীর থেকে। তারপর দাম না পেয়ে সেগুলোতে হয়েছে গরুর খাবার। ফেলে দিতে হয়েছে বস্তা বস্তা সবজি। যে সবজি চাষ করে ধান চাষের লোকসানের কিছুটা সংকুলান করে চাষিরা। সেই সবজিতেও চাষির গুনতে হলো লোকসান।
এরপর আবার আসছে ধান। মাঠে মাঠে ধানের ফলন যথেষ্ট হয়েছে বলে চাষিরা মনে করছেন। তারা বলছেন গত সবজির চাষে খুব লোকসান গুনেছেন তারা। এবার ঘরে ধান উঠলে তাদের খোরাকীটা চলবে হয়তো। তবে মৌসুমের সময় ধানের যে দাম থাকে তাতে তাদের সমস্যার সমাধান হবে না মোটেই। ঘরে খোরাকী রেখে পরের আবাদের জন্য আবার তাদের এনজিও বা ব্যাংক থেকে ধার দেনা করতে হবে। না হলে আবাদ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ঠিক এমন সময় যখন চাষিরা চালের দাম সহনীয় হবার কথা শুনছেন তখনই তারা বুঝতে পারছেন ধানের দামটা কত নিচে নামতে পারে। বাজারে ব্যবসায়ীদের সার্থে এই মুহূর্তে সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়া হলো। সেই তাদেরই সার্থে আবার চালের দামও কমানো হবে। তার অর্থ দাঁড়ায় ধানের দামও কম হতে হবে। আর ধানের দাম কম হওয়া মানে চাষির আবার লোকসান গোনা। যেটুকু আশা জেগেছিল চাষিদের মধ্যে। আবার তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিল ওপর মহল থেকে চাষির জন্য এক সর্বনাশা বার্তা।
প্রকৃতপক্ষে কৃষকের সুবিধা অনুবিধা ভেবে কাজ করে না কোন সরকারের কেউ কোনদিন। তারা সর্বদাই আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের প্রিসক্রিপশান ফলো করে। দেশের ধনী আর আমলাদের সুবিধার্থে চাষিকে ঠকিয়ে চলে প্রতিনিয়ত। হ্যাঁ, চালের দাম সহনীয় করতে গেলে চাষি যে জিনিসগুলো কিনবে, তার প্রত্যেকটি জিনিসের দাম সহনীয় করতে হবে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দামও কমিয়ে আনতে হবে। কারণ এর দাম বৃদ্ধির প্রভাবটা চাষি শ্রমিকসহ খেটে খাওয়া মানুষদের ওপরই বেশি পড়ে। যারা ব্যবসায়ী, তাদের মুনাফা বাড়ে। চাকরিজীবিদের বেতন বাড়ে। কিন্তু খেটে খাওয়া কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের ন্যয্য পাওনাটা তো বাড়েই না, আরো তারা মূল্যটা হাতেও পায় না ঠিকমতো। ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবটা তাদের ওপরই বেশি প্রভাব ফেলে। এজন্য দ্রব্যমূল্য কমানো বাড়ানোর সময় অবশ্যই দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের সমস্যার কথাগুলো মাথায় রেখে কাজ করা অবশ্যই জরুরী। বাংলাদেশের ভিত্তি এই কৃষক আর কৃষিকে অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখতে রাখতে এবং সাবলিল রাখতে হবে। তাছাড়া দেশের অগ্রগতি কিছুতেই সম্ভব নয়।
নির্বাহী সম্পাদক
Leave a Reply