আজ ১লা মে। মহান মে দিবস। ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকদের সম্মিলিত আন্দোলনের ফসল এ দিনটি। ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করার বদলে ৮ ঘণ্টা কাজ করা ও ন্যয্য মজুরি পাওয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে এ আন্দোলন চালিয়ে আসছিল শ্রমিকরা। শাসক শ্রেনির গুলিতে সেদিন প্রাণ দিয়েছিল পুলিশসহ ১১ শ্রমিক। তারপরও থেমে থাকেনি শ্রমিকদের আন্দোলন। অবশেষে শাসক শ্রেনি মেনে নিতে বাধ্য হলো শ্রমিকদের দাবি। তথাপিও আট ঘণ্টা কাজের নিশ্চয়তা পেলেও সারাবিশ্বে শ্রমিকদের ন্যয্য মজুরি পাওয়া নিয়ে এখনো চলছে নানা টালবাহানা।
বিশেষ করে আমাদের দেশে ৭ কোটি ৪০ লাখের অধিক শ্রমিক রয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই শ্রমিক শ্রেনির। আর অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে হলে শ্রমিক শ্রেনির ভূমিকাই সর্বশীর্ষে। কারখানায় শ্রমিক না হলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে থাকে। কৃষকের ক্ষেতে কৃষি শ্রমিক না গেলে ফসল ফলানো সম্ভব নয়। আমাদের দেশ থেকে কয়েক কোটি শ্রমিক বিভিন্ন দেশে গিয়ে তারা শ্রমিকের কাজ করছে। বিনিময়ে আমরা পাচ্ছি রেমিটেন্স। যা বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম বৃহৎ অংশ। আর সে সব দেশের শিল্প কারখানার উন্নয়ও সম্ভব হচ্ছে শ্রমিকের শ্রম থেকেই।
শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও মালিক পক্ষ তাদের ন্যয্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রাখে। আমরা এ বছরেও দেখতে পেলাম ঈদের সময় শ্রমিকদের বেতন দেয়া হলো না। এমনকি ঈদের দিনেও শ্রমিকরা খাবারের থালা হাতে নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে হাউ মাউ করে কেঁদেছে তাদের ৭ মাসের বকেয়া বেতন পাওয়ার জন্য। ঈদের আনন্দের দিন কেটেছে তাদের কান্না দিয়ে। আর মালিকরা বিদেশের বিলাসবহুল হোটেলে বসে টেলিভিশনে দেখেছেন সেই দৃশ্য। আমরা এই শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে পারিনি। আমাদের জন্য এটি একটি বড় লজ্জা।
সেই ১৮৮৬ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই একশত ঊনত্রিশ বছর পরেও শ্রমিককে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে হয় বকেয়া বেতন পাওয়ার জন্য। গুলি খেতে দেখলাম আমাদের দেশের শ্রমিককে। পুলিশী নির্যাতনও সহ্য করতে দেখলাম আমরা শ্রমিকদেরকে। আবার আমরাই ঘটা করে সারাদেশে পালন করছি এই মহান মে দিবস তথা শ্রমিক দিবস। আমার মনে হয় এটি এক ধরনের রসিকতা। শ্রমিকদের নিয়ে আমরা মসকরা করছি। আসলে তাদের ন্যয্য পাওনা পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। আবার তাদের দাবি আদায়ের দিনটি বেশ ঘটা করে পালন করছি। অতি সাধারণভাবে এটি একটি উপহাস ছাড়া অন্য কিছুই মনে হয় না।
আসলে আমাদের মানসিকতার আমুল পরিবর্তন দরকার। বাহানা দিয়ে যেমন পেট ভরে না। তেমনি সমবেদনাও সব সময় মনকে আশ্বস্ত করে না। আমরা যতদিন শ্রমিকদের ন্যয্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে না পারছি। ততদিন যতই তাদের নিয়ে শ্রমিক দিবস পালন করি, বড় বড় আশ্বাসের বাণী দিয়ে তাদেরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি। সেটি অবশ্যই অমানবিকতার পরিচয়ই হবে। আসুন আমরা আজ, এই এখন থেকেই একটু একটু করে মানবিক হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। শ্রমিক আর মালিকের মধ্যকার বিভেদকে দূর করে পরস্পরের সম্পর্ককে বন্ধুত্বের পর্যায়ে উন্নীত করতে সহায়তা করি। তাহলেই দূর হবে শ্রমিক অসন্তোষ। তরান্বিত হবে দেশের অর্থনীতি তথা অগ্রগতিও।
নির্বাহী সম্পাদক
Leave a Reply