কবি পরিচিতিঃ ১৯৯৫ সালের ২৮ মে খুলনা জেলার আকড়াবাড়ি চরদীঘলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন তরুণ কবি অনির্বাণ ঘোষ দীপ্ত। নিজ গ্রামের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি। তারপর দীঘলিয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসএসসি এবং খুলনা সুন্দরবন আদর্শ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন এই তরুণ কবি।
বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠে পেকে ওঠা ধান। লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে নিয়ে একটা কৃষক তার মাথাল পাশে রেখে বড়ের আগুন থেকে হুকো জ্বালাচ্ছে। বাঁশ বাগান পেরিয়ে আম কাঁঠালের বনের পাঁশ দিয়ে এক কৃষাণী কলসি কাঁখে নদী থেকে জল নিয়ে ফিরছে। অদুরে পাল তোলা নৌকা। কূলের কাছে উজানের নৌকায় গুণ টেনে নিয়ে যাচ্ছে মাঝি। দুরন্ত বালেকের লাফিরে ডিগবাজি দিচ্ছে। কিশোরদের দল খেলছে ডুব সাঁতার। এরকমই একটি নদীর পাশে কবির গ্রাম। নদীর মাঝখান দিয়ে চলে ট্রলার আর সহপাঠিদের সাথে কবি হাঁসেদের মতো ডুব দিয়ে শোনেন তার শব্দ। এমনই কেটেছে তার শৈশব। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। তার কবিতার মাঝে সাম্যবাদী ধ্যান ধারণার পরিচয় পাওয়া যায়।
১। গরু ও সাম্যবাদী পিঁপড়ে
একসময় গরু গুলো শান্তিতে থাকতো
দিব্যি খাওয়া নাওয়া জাবর কাটা
বোবাদের মতো শত্রু ছিলো না
বোবাদের কোন শত্রু থাকে না।
ঘাঁড়ের উপর জোঁয়াল পড়লে
ঠিকই ওরা লাঙ্গল টানে।
পিপড়েদের মতো সাম্যবাদ ওরা জানে না
খড়কুটো ছাড়া শস্য দানা ওরা চায় না।
ঠিক যখনই কলের যন্ত্রে
জমিন মাঝে গর্জে ওঠে বিকট শব্দ।
ঠিক তখনি মাঠ পেরিয়ে
কে শোনে তার বাঁচার চিৎকার
কসাইখানার ছুরির ঝংকার।
ওর জন্ম অন্যের ক্ষুধা মেটাতে
মাথা গোঁজবার ছাউনিও আছে ঠিক ততক্ষণ
যতক্ষণ ওরা অন্ন বস্ত্র আহার যোগায় প্রভুর জন্য।
নিজের পেটের জ্বালাপোড়ায় চিৎকার দিলে
অমনি চলে দুড়ুম দাড়ুম পিঠের পরে।
তবু ওরা প্রতিবাদ শেখেনি
শিং আছে বটে ব্যবহার জানেনি।
২। বসন্ত
আজ বসন্ত কি না জানি না
তবে দক্ষিণ দুয়ার আছে খোলা
ধুলোয় ক্ষীণ হয়ে আসা দৃষ্টিসীমা
যন্ত্রের শব্দে বেড়ে ওঠা মাথার যন্ত্রণা।
শিমুল পলাশ হয়তো এখানে নেই
খোলা ছাদে বারোমাসি বাতাবিলেবুর মুকুল ফুঁটে থাকে
কইতরের খোপের মতোন বহুতল বাসা
নিয়ম করে সিঁড়ি দিয়ে আসা যাওয়া।
গাড়িগুলোর হুঙ্কার দিয়ে ছেড়ে দেয়া কালো ধোঁয়া
চিড়িয়াখানার কোকিল হয়তো ভুলে চিৎকার করবে কুহু।
গেল বছরে উদম শ্বাসকষ্ট পুষি
ক্ষেতের আল বরাবর হেঁটে চলা গরুর মতো মুখে পরি ঠুসি।
তবু কারা যেন শাড়ি পরে ফুল বাঁধে খোঁপায়
কোকিলকে ডাকে যেন বসন্ত বন্দনায়
আজ বসন্ত কিনা জানি না
তবে দক্ষিণ দুয়ার রেখিছি খোলা।
৩। পুঁজিরাষ্ট্র প্রেমধর্ম ও আমরা
যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকদের মতো
কিউপিডকে দাসত্বের শেকলে বেঁধেছে পুঁজিবাদ
নীতিশাস্ত্রজ্ঞের বাণী পড়তে পাঠশালা অভিমুখে
হাতে খড়ি দেওয়া স্মৃতি খসে পড়া উল্কার মতো অতীত হয়ে যায়
সমাবর্তন শেষে আমরা হয়ে উঠি যেমনটা
তেমনটা বলেই গালি দেই একে অন্যকে।
ঘুষের টাকাতেও চক্রবৃদ্ধিহার কষি পরীক্ষার খাতার মতো
ধর্মশাস্ত্রের অক্ষরগুলো কান পর্যন্ত আসার আগেই
নষ্টবীজের মতো অঙ্কুরোদয় হয়ে ওঠে না।
অভাগা কৃষকের অনুর্বর ক্ষেতের মতো
আমরাও উর্বরতা হারিয়ে ফেলি
সুদের ভাগ ঈশ্বরকেও দিয়ে দেই
বুভুক্ষুর পেটে পা রেখে স্বর্গের সিঁড়ি যদি ধরা যায়
কেউ বলে ওঠে ধর্ম পুঁজিপতির পুঁজি রক্ষার দূরদর্শী দলিল।
যেখানে আশার বপন করা হয়েছে হতভাগা মানুষের দীর্ঘশ্বাসে
পুঁজিবাদ চানক্যের কূটনীতির মতো
আলেকজেন্ডারের মতো বীরকেও দুর্বল করে দেয়।
ধনী শিক্ষালয় হাসপাতাল বা ধনিদের বিনোদন পদ্ধতি থেকে
ধুমপানের ধোঁয়া পর্যন্ত পৃথক।
পরিশেষে অধিকারে প্রশ্ন উঠলে
বন্দুকের নল দিয়ে ছুটে আসা গুলি
বুকে এসে বিঁধবে যারা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে।
হয়তো ঘুষখেয়ে কিউপিড তার তীর ছুঁড়ে দেয়
রাষ্ট্র আর পুঁজিপতির হৃদয়ে।
দেবতা কি পুঁজিবাজারে প্রেমকে বেঁচে দেয়
নাকি পুঁজির কাছে স্বয়ং পরাজিত হয়!
৪। খাটাশ রাজার দেশ
মাঠটা যখন উলুতেই ভরে গেলো
মুক্তাটাকে যতন করে রেখো
রাজ্য যখন খাটাস রাজা নিলো
মুক্তাটাকে যতন করে রেখো।
ওই মুক্তা ঝিনুক বুকে রাখে
শ্রমিকের হাতের কারুকাজে
যোগ্য জনের গলায় দারুণ সাজে
বনটা নিলো খাটাশ রাজা এসে
সেকি বোঝে রত্ন কারে বলে!
বনটা যখন উলুতেই ভরে গেলো
মুক্তাগুলো যতন করে রেখো।
মৌমাছিদের কষ্টে মধু জমে
অপাত্রে যদিই রেখে দিলে
মধুর মর্ম বুঝলে কি আর শেষে
এ মানহানিকর মধুকরের শ্রমে।
মাঠটা যখন উলুতেই ভরে গেলো
মুক্তাটাকে যত্ন করে রেখো
রাজা যখন খাটাশ রাজা হলো
বনটা ছেড়ে অন্য কোথাও চলো।
৫। ভয়ের কাছে মাথানত করি
হিম সকালে প্রভাকরের কাছে
দেহ মেলে দেয় কিশোরী
সূর্যও তার প্রেম মেখে দেয় শরীরে
যখন শাসকের মতো তপন হয়ে ওঠে
তপ্তরোদে কিশোরী লুকায় নিজেকে।
আজ ব্যাধিগ্রস্ত এ সমাজ
প্রতিকারের নাম উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া
ধ্বজা ভাঙা রথ নিয়ে মৌন মিছিলে
ভয়ের কাছে মাথানত করি।
বাঘকে সামনে রেখে জনতার জোয়ারে ক্ষমতার সমাবেশ
বিড়ালের মতো মিয়াঁও মিয়াঁও আওয়াজ তুলি
ম্যাকিয়াভেলি আমায় দেখে মুচকি হাসে
আমরা যতই হরিণের মতো নিরামিষাশী হই
শাসক ততই সিংহ হয়ে যায়।
ভয়ের কাছে মাথা নত করি
ভয়ের কাছে মাথা নত হয়ে যায়।
যুবরাজ শিষ্যের কাছে নত হয় গুরুদেব
নৈরাজ্যের কাছে নত হয় জনতা
টাকার কাছে নত হয় আমলা
লোভের কাছে নত হয় সাম্যবাদ
নেতার কাছে নত হই আমরা
অথচ গণতন্ত্র!
ভয়ের কাছে মাথা নত হয়ে যায়
মাথা নত করি আমরা।
সমাপ্ত
Leave a Reply