আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অসাধারণ প্রতিভাবান বাঙালি চিত্রকার জয়নুল আবেদিন। তিনি ১৯১৪ সালে ২৯ ডিসেম্বর বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। দিনটিকে প্রতিপাদ্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শুরু হয়েছে তিনদিন ব্যাপি জয়নুল উৎসব। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন আজ পালন করবে নানা রকম কর্মসূচি। এতে থাকবে নানা রকম আয়োজন।
জন্মের পর জয়নুল বেড়ে উঠেছিলেন ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সবুজ শ্যামলিমায়। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের বিভক্তির পর জয়নুল আবেদিন ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। সে সময়ে ঢাকায় চিত্রকলা শিক্ষার কোন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন অন্যান্য শিল্পকর্মীদের সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন ইনস্টিটিউট অবআর্টস এন্ড ক্র্যাফটস। এর মধ্য দিয়েই তিনি গড়ে তুলেছিলেন আধুনিক শিল্প আন্দোলন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
১৯৫১ সালে তিনি লন্ডনের স্নেড স্কুল অব আর্টে দুই বছরের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসার পর জয়নুলের চিত্রে নতুন একটি ধারা দেখতে পাওয়া যায়, যাকে বলা যায় ‘বাঙালি ধারা। ১৯৭৫ সালে জয়নুল আবেদিন সোনারগাঁয়ে একটি লোকশিল্প জাদুঘর এবং ময়মনসিংহে একটি গ্যালারি (শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা) প্রতিষ্ঠা করেন। এ দুটি প্রতিষ্ঠানে তার অঙ্কিত কিছু চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। তার অসাধারণ শিল্প-মানসিকতা ও কল্পনাশক্তির জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধিতে ভূষিত হন। ‘৭৬ সালের মন্নস্তরে দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকে বিশ্ববাসীর কাছে নিজের মননশীল কল্পনা ও স্বতন্ত্র সৃজনশীলতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন জয়নুল। ৬৫ ফুট দীর্ঘ এক বিখ্যাত চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন ১৯৭০ সালে।
বাংলাদেশে চারুকলা চর্চা ও আন্দোলনের দিশারী জয়নুল আবেদিনের বাবা ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ ও মা ছিলেন জয়বুন্নেছা। শৈশবেই ছবি আঁকার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল তাঁর। ফল, ফুল, গাছপালা, লতাপাতায় রৌদ্র ছায়ার খেলা তিনি রংতুলির ক্যানভাসে তুলে ধরতেন। ১৯১৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়েই তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যান কলকাতায়। সেখানে গভর্নমেন্ট স্কুল আর্টসে ভর্তি হয়ে শুরু করেন তাঁর পছন্দ মতো অধ্যাবসায়। সেখানে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত শিল্পচর্চায় দীক্ষা নেন তিনি। সে বছরেই ড্রইং এন্ড পেইন্টিং বিভাগে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তারপর চলে আসেন ঢাকায়। তাঁর হাত ধরেই এদেশের চারুশিল্প মাধ্যম বিকশিত হয়।
মানুষকে কেবল দেয়ার জন্য যারা পৃথিবীতে আসেন, তারা কম সময়ই পৃথিবীতে থাকেন। কেন যেন তাঁরা দ্রুত চলে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়েই আসেন। তবে দিয়ে যান অনেক বেশি কিছু। আর চিরঋণী করে যান বিশ্ববাসীকে। যা কোন দিনই শোধ হওয়ার না। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কেবল নিজেই পরিচিত হননি। সারা বিশ্ববাসীকর কাছে বাঙালি ও বাংলাদেশকেও পরিচিত করে দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে। বিশ্বজুড়ে তাঁর এই সৃজনশীল কর্মের দৃষ্টান্ত রেখে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে এই গুণী শিল্পী চলে যান না ফেরার দেশে। আজ তাঁর ১১০তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাবনত মস্তকে স্মরণ করি এই গুণী শিল্পী আচার্য জয়নুল আবেদিনকে।
নির্বাহী সম্পাদক
Leave a Reply