বেশ আগের কথা। তখন দেশে সয়াবিন তেলের এত চাহিদা ছিল না। সরিষার তেল দিয়েই রান্নার কাজ করা হতো। বিদেশী প্রভুদের পরামর্শে দেশে সয়াবিন তেলের প্রচলন শুরু করার উদ্যোগ নেয়া হলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। নানারকম প্রচার চালানো হলো মানুষকে সয়াবিন তেলের প্রতি আসক্ত করার জন্য। বলা হতো একদম চর্বিমুক্ত সয়াবিন তেল। এতে ক্ষতিকর কোন উপাদান নেই। পুষ্টিতে ভরপুর বলেও প্রচার করা হতো। এখনো যে সে প্রচার নেই, তা ঠিক নয়। তবে মানুষ বুঝতে শিখেছে কোনটা আসল আর কোনটা নকল।
ঠিক সেই সময়কার কথা। বাবার সাথে গিয়েছিলাম বাজার করতে। বাবা চাচ্ছিলেন খাঁটি সরিষার তেল। আর দোকানি বলছে পিওর সয়াবিন তেল আছে। আপনি এটা নিয়ে যান। আমার স্পষ্ট মনে আছে বাবা বলেছিলেন, সয়াবিন তেল আবার পিওর হয় কী করে? মানুষের মাঝে ভেজাল থাকলে মানুষ তাকে সয়াবিন বলে। আর সেই সয়াবিন তেলকে আপনি পিওর বলছেন। আপনার মধ্যে সমস্যা আছে।
দোকানি বেহায়ার মতো আবার প্রশ্ন করলো, আপনি সরিষার তেলই চান কেন? সয়াবিন তেলের রান্না একবার খেয়ে দেখুন। বাবা বলেছিলেন, সরিষার তেল দিয়ে ভর্তা খাই, গায়ে মাখি, হাতে মুখে মাখি। অতি উৎসাহী দোকানি বললো, গায়ে মুখে ক্রিম মাখবেন। সরিষার তেলে তো চোখ জ্বলে যায়। বাবা খানিকটা রেগে গিয়েই বললেন, জ্বলে জ্বলুক তবু আমার সরিষার তেল চাই। কথাটা বলে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে অন্য দোকানে চলে গেলেন। দোকানি বারবার ডাকলেও আমরা আর ফিরে যাইনি ওই দোকানে। দোকানি ওইদিন একটি খরিদ্দার হারালো।
ঘটনাটি এই জন্য বললাম যে, আজ দেশের সরিষার তেলেও ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে। আর সেদিন যে সয়াবিন তেল সস্তা বলে প্রচার করা হতো, আজ সেই সয়াবিনের দামও চলে গেছে নাগালের বাইরে। তাছাড়া মানুষের বিশ্বাসও উঠে গেছে তার ওপর থেকে। মানুষ আবার সরিষার চাষের পরিমাণ বাড়াতে শুরু করেছে।
দেশের মানুষ তেমনই বিশ্বাস হারা হচ্ছে দেশের চলমান রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি। সয়াবিন তেলের মতোই রাজনৈতিক দলগুলোর লোভনীয় প্রচারে মুগ্ধ হয়ে দেশের মানুষ একের পর এক ঠকেই আসছে ৫৩ বছর ধরে। পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় বসা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেউ ধর্ম নিয়ে, কেউ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, আবার কেখনো দুটো বিষয় নিয়েই ব্যবসা করার চেষ্টা করে গেছে। মিথ্যে বলা হয়েছে গণতন্ত্রের কথা। গণতন্ত্রের কথা বলে কেবল মিথ্যা প্রলোভন দেখানো হয়েছে দেশের মানুষকে। আসলে গণতন্ত্রের স্বাদ কী তা চেখে দেখার সুযোগও পায়নি বাঙালি জাতি। না পেয়েছে ধর্মীয় আদর্শের সমাজ ব্যবস্থা। কেবল পেয়েছে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি আর গণতন্ত্রের নামে গলাবাজি। দিনের শেসে সবাই সেই সয়াবিন।
সম্প্রতি শুরু হয়েছে আরেক গলাবাজি। একটি রক্ষণশীল গোষ্ঠী খাঁটি সরিষার তেলে বিশ্বাসী না। তারা পিওর সয়াবিনের প্রচলন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মানে পিওর ভেজাল। তারা ’৭১-এর পরাজিত শক্তি। সেই পরাজয়ের জন্য তারা এতটুকু অনুতপ্ত নয়। বরং তারাই সঠিক, তাদের পথ সঠিক এমনটিই প্রতিষ্ঠা করতে চায় দেশে। স্বাধীনতার মূল নায়ক শেখ মজিবের কথা বাদ দিলে তেমন কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। সেখানে মূল নায়ক হিসেবে সামনে চলে আসে দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মেহনতি মানষেরা। তারাই ’৭১-এ যুদ্ধ করে, জীবন দিয়ে দেশ মাতৃকাকে রক্ষা করেছিল। কিন্তু আজ সেই পরাজিত শক্তিরা বলছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল নায়ক কায়েদি আযম জিন্নহ। যিনি ছিলেন স্বাধীনতার প্রধান শত্রু।
তার মানে কী দাঁড়ালো? সেই দোকনির সরিষা তেলের বদলে সয়াবিন তেল বেচার অপচেষ্টা। তবে দেশের মানুষ আজ অবশ্যই আসল নকল বুঝতে শিখেছে। তারা যতই রং চং লাগিয়ে ভিলেনকে হিরো সাজানোর চেষ্টা করুক, দেশের মানুষ বুঝতে শিখেছে কে ভিলেন আর কে হিরো। সেই সরিষা তেল আর সয়াবিন তেলের মাঝে প্রকৃত তফাৎ।
নির্বাহী সম্পাদক
Leave a Reply