বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেছে বেশ আগে। স্বাধীনতার ৫৩ বছরে আমাদের প্রত্যেকটি জাতীয় দীবসে ভারত স্বতস্ফূর্তভাবে স্মরণ করে যথাযথ সম্মান দেখিয়ে। তাতে আমরা বাংলাদেশবসীরাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকি। কারণ দেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। এ দিনগুলো আমাদের সাথে সাথে ভারতবাসীরাও স্মরণ করে, আমাদেরকে সহমর্মীতা জানায়, এতে আমরাও তাদেরকে সম্মান জানাই। তবে, এ বছরের ১৬ ডিসেম্বর তথা বিজয় দিবসের প্রসঙ্গটা ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে।
যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদার মোদী বলছেন ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের এ বিজয় বাংলাদেশের নয়, এ বিজয় ভারতের। আমাদের দেশের বিজয়কে অন্য দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা যদি তাদের দেশের বিজয় বলে স্বীকার করেন, তাতে গর্বে আমাদের বুক ভরে ওঠার কথা। তবে যেখানে আমাদের দেশের বিজয়কে একেবারেই অস্বীকার করে কেবল ভারতের বিজয়ের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের সারবভৌমত্বকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। তা অবশ্যই এদেশের অস্তিত্বকে কেবল অস্বীকারই করে না, সেটি একটি হুমকিও হয়ে দাঁড়ায় বটে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এহেন বক্তব্যকে আমরা সম্মান জানাতে পারি না।
একটু পেছনে ফিরে দেখি ইতিহাস কী বলে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরুর আগে, অর্থাৎ প্রস্তুতিকালের কিছু কথা তুলে ধরি। মূলতঃ স্বাধীনতার কথা কখন আসলো? পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরেও যখন শেখ মুজবুর রহমানকে ক্ষমতায় বসতে দেয়া হলো না। ঠিক তখন শেখ মুজিবুর ছয় দফা দাবির খসড়া নিয়ে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে গেলেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সাথে যুদ্ধ করে তাকে ক্ষমতায় বসতে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিলেন। ইন্দিরা গান্ধী বললেন, তিনি নিজে কিছু বলতে পারেবেন না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ যদি অনুমতি দেন, তাহলে তিনি সহযোগিতা করবেন।
শেখ মুজিবুর তখন চলে গেলেন রাশিয়ায়। ছয়দফার খসড়া দেখে তিনি বললেন, এই খসড়ার দাবি নিয়ে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া যাবে না। কারণ, এটি কেবল একজনের ক্ষমতার ব্যাপার। যদি আপনি আপনার ভূখণ্ডকে স্বাধীন দেশ হিসেবে পেতে চান, তাহলে আমি ভারত সরকারকে বলব, এমনকি রাশিয়াও সহযোগিতা করবে। শেখ মজিব বললেন ঠিক আছে, আমি স্বাধীন দেশই চাই। ব্রেজনেভ বললেন তাহলে এ খসড়াটি নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে নতুন খসড়া করে নিয়ে আসুন, তারপর অনুমতি দেয়া যাবে। উনি তখন দেশে ফিরে এসে তৎকালীন নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্টদের সাথে কথা বলে আর পাঁচ দফা যোগ করে ১১ দফার খসড়া নিয়ে রাশিয়ায় গেলেন কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে নিয়ে। তারপর ভারতকে অনুমতি দিলেন ব্রেজনেভ।
অনুমতি পেয়ে প্রস্তুতি নিতে নিতে অনেক সময় পার হয়ে গেল ভারতীয় সেনাদের। অবশেষে ৩রা ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগদান করে ভারতীয় সেনারা। টানা নয়মাস যুদ্ধ করে আসছিল আমার দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, জনতা মিলে। আজ অহঙ্কার ভরে বিজয়ের সবটুকু গৌরব অন্য কেউ নিতে চাইবে, তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের দেশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে সারাবিশ্ব যখন স্মরণ করে, শহীদদের জন্য যখন শোক পালন করে তখন গর্বে আমাদের বুক ভরে ওঠে। ঠিক তেমনই আমাদের বিজয়কে অন্য কেউ যদি সম্মানজনকভাবে দেখে তখনও আমরা গৌরাবান্বিত হবো। তবে অবশ্যই তা হতে হবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে যথাযথ সম্মান দেখানো।
নির্বাহী সম্পাদক
Leave a Reply