সোহাগ সন্ধিঃ বাংলাদেশের দুর্গম পাহাড়ী এলাকা নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুরে জন্ম গ্রহণ করে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চিরস্মরণীয় আছেন বিপ্লবী কমরেড মণি সিংহ। বৃটিশ বিরোধ নানকার, টংক ও তেভাগা আন্দোলন গড়ে তুলে কৃষক ও জনসাধারণের অধিকার আদায়ের এক চূড়ান্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। দুর্গাপুরের প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। তারপরও তিনি ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। তৎকালীন জমিদারদের জনসাধারণের ওপর শোষণ, অত্যাচার ও জুলুমকে মেনে নিতে পারেননি তিনি। অত্যাচারিত নিপিড়ীত মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখে তার প্রাণ কেঁদে উঠতো। তাই তিনি কিশোর বয়সেই ক্ষেপে উঠেছিলেন তার সেই পূর্বপুরুষের লালিত জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে। শোষন অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিপ্লবের মহামন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে হয়ে গেলেন সংসার ত্যাগী। তাকে বশ করে রাখার ব্যর্থ প্রয়াসে পরিবার থেকে অতি চেষ্টা করে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিলেন। কিন্তু তাতেও তিনি বশ মানলেন না। নববধুকে ছেড়ে বিবাগী হলেন বিপ্লবের পথে।
কলকাতায় গিয়ে কমরেড মণি অখণ্ড ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সাথে পরিচিত হলেন। যোগ দিলেন তাদের দলে। অতঃপর ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা দুটি রাষ্ট্র হলে আমাদের এই ভূ-খণ্ড অর্থাৎ পাকিস্তানের অংশ হয়ে পূর্বপাকিস্তান নাম পেল। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টির পৃথক প্রাদেশিক কমিটি গঠন করা হয়। কমরেড খোকা রায়কে সাধারণ সম্পাদক করে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে কমরেড মণি সিংহ সদস্য পদ লাভ করেন। তবে প্রাদেশিক পার্টি গঠনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বলে গণ্য করা হয়। পরবর্তীতে যখন তিনি যখন পার্টির সভাপতির দায়িত্ব নেন, তখন তাকে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আখ্যা দেয়া হয়।
১৯৬৬ সালে শেখ মজিবের ছয় দফা আন্দোলন জোরদার হয়। তা নিয়ে কমিউনিস্টদের মধ্যেও দ্বিমত সৃষ্টি হয়। একই সময় কমিউনিস্ট মতাদর্শের ওপর ভিন্ন মত প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ নিয়ে সোভিয়েত এবং চীনের মধ্যে বিভক্তি ঘটে। তার প্রভাব আমাদের দেশের কমিউনিস্টদের ওপরও পড়ে। পার্টির মধ্যে ভাঙনের সুর ওঠে। তখন কমরেড মণি সিংহ অনেক চেষ্টা করেছিলেন পার্টিকে অখণ্ড রাখতে। যদিও তিনি সে চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছিলেন তবুও একটি বড় অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন বিলোপবাদের খপ্পর থেকে বাঁচিয়ে। কমরেড মণি সিংহ, খোকা রায়, আঃ সালাম(বারিণ দত্ত), অনীল মুখার্জি, শহীদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, চৌধুরী হারুনর রশিদ প্রমুখ কমরেডদের নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করে মস্কোপন্থী মতাদর্শের ওপর পার্টিকে ধরে রেখেছিলেন। বিপরীতে মোহাম্মদ তোয়াহা ও সুখেন্দু দস্তিদার কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরে পিকিংপন্থী মতবাদ প্রচারের ব্রত নিলেন। পরে সেই অংশ থেকেই বারবার বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
কমরেড মণি সিংহ কেবল কমিউনিস্ট পার্টিকেই সুসংহত রাখেননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তার আবদান অনস্বীকার করার কোন উপায় নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্বালে মুক্তিযদ্ধের পক্ষে সমর্থন ও সহযোগিতা আদায়ের জন্য শেখ মুজবকে সঙ্গে নিয়ে ভারত ও রাশিয়াতে গিয়েছিলেন। যুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলন কমরেড মণি সিংহ। এছাড়া সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তার এই বিপ্লবী ভূমিকা কোনদিন ম্লান হবার নয়।
Leave a Reply